দেশে কার্যত একটা দ্বিদলীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে: খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম জাতীয় নির্বাচনে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল অংশ নেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশে কার্যত একটা দ্বিদলীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ কারণে অনেক সময় পরিবেশবান্ধব ও ভালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রার্থীরা যথেষ্ট নাগরিক সমর্থন পান না।’
আজ শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ প্রকাশ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিং আয়োজন করে সিপিডি। সহযোগিতা করে তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত এবং তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কর্মসূচি পরিচালক শওকত আরা।
অনুষ্ঠানে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দ্বিদলীয় নির্বাচনকাঠামোয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখানে নাগরিকদের বহুমাত্রিক প্রত্যাশা অনেক সময় প্রার্থীদের নির্বাচনী লক্ষ্য ও কর্মসূচিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এর ফলে ভোটারদের মধ্যে একধরনের সুবিধাবাদী প্রবণতা দেখা যায়। তাঁরা যে প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তাঁকেই ভোট দেন। এতে পরিবেশবান্ধব বা এলাকার জন্য ইতিবাচক কাজ করা প্রার্থী থাকলেও ভোট কম পান।
পরিবেশদূষণের মূল কারণ এড়িয়ে যাচ্ছে
সিপিডির জরিপে বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি—এই তিন বিষয়কে ভোটাররা সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এসব সমস্যার মূল কারণ ও কাঠামোগত সমাধান নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে গেছেন ভোটার ও প্রার্থীরা। ফলে পরিবেশের সংকট মোকাবিলায় সনাতন চিন্তাধারাই প্রাধান্য পাচ্ছে বলে জানান সিপিডির গবেষকেরা।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ সমস্যার সমাধান হিসেবে গাছ লাগানো বা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের মতো পরিচিত ধারণার কথা বলেছেন। তবে শিল্পবর্জ্য, ইটভাটা, রাসায়নিক কারখানা কিংবা অবৈধ শিল্পের মতো বায়ুদূষণের প্রকৃত উৎস নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাঁরা বলেননি। এতে বোঝা যায়, মানুষ হয় এসব কারণ জানেন না, নয়তো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে এসব বিষয়ে কথা বলতে ভয় পান।
পরিবেশ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য নদী ভরাট, অবৈধ বালু উত্তোলন, পাথর চুরি ও অবৈধ শিল্পকারখানা বন্ধ করা জরুরি বলে জানান খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থানের নামে ইটভাটা, বালু উত্তোলন বা রিয়েল এস্টেটভিত্তিক কাজকে উন্নয়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ত্রুটিপূর্ণ। এসব ইস্যু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় প্রার্থীরা তা এড়িয়ে যাচ্ছেন।
দেশে এমপিনির্ভর উন্নয়নকাঠামো কার্যকর হবে না বলে মনে করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, সিপিডির জরিপে এমপির ভূমিকা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা উঠে এসেছে। ভোটাররা এমপিকে প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণের জায়গায় দেখতে চান। দৈনন্দিন স্থানীয় সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ভোটাররা স্থানীয় সরকারের ওপর দিতে চান। তাই স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ইশতেহারে সুস্পষ্ট অর্থায়ন কাঠামো নেই
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার লোকদেখানো কি না, অনুষ্ঠানে এমন প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইশতেহারকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা বেড়েছে। এটি ইতিবাচক। তবে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করেছি আমরা। প্রায় সব দলই ইশতেহারে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও বড় প্রত্যাশার কথা বলেছে। তবে এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা নেই। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার যে ধরনের অর্থায়ন সংকট রেখে যাচ্ছে, তাতে নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অর্থের সংস্থান করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’
এবারের নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন করেন আরেক সাংবাদিক। জবাবে পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, পতিত একটি দলের (আওয়ামী লীগ) ভোট এবারের নির্বাচনে ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর অর্থ হলো, একটি বড় অংশের ভোটার তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে ভোটারদের প্রার্থী বাছাইয়ের স্বাধীনতা কিছুটা হলেও সীমিত হচ্ছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটিংয়ের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অর্থনৈতিক সংস্কারের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের সময়েও ধারাবাহিকতা রাখা জরুরি বলে মনে করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে যে সংস্কার কার্যক্রম চলছে, সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিবর্তন না আনার অনুরোধ করব।’