আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য খড়্গ আসবে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

আজ সোমবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ঢাকা চেম্বার আয়োজিত প্রাক্‌-বাজেট আলোচনা সভায় বক্তাদের একাংশছবি– প্রথম আলো

আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো খড়্গ আসবে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, রাজস্বের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে করের আওতা বাড়ানো হবে। কিন্তু এ জন্য ব্যক্তিগত করের হার বাড়ানো হচ্ছে না, বরং করজাল সম্প্রসারণ করা হবে।

আজ সোমবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ঢাকা চেম্বারের প্রাক্‌-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মনজুর হোসেন ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যে দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে, তার ইতিবাচক প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে। বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো ধরনের খড়্গ আসবে, এমন আশঙ্কার কারণ নেই। অর্থমন্ত্রীর প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে; তিনি ব্যবসাবান্ধব ব্যক্তি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ। তাই মূল বিষয়টি না বোঝার কারণ নেই।

যুদ্ধের প্রভাব

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে সরকার গঠন করিনি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। ১০ ডলারের এলএনজি আমাদের স্পট মার্কেট থেকে ২০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। ৫০ থেকে ৬০ ডলারের ক্রুড অয়েল ১১৬ ডলারে কিনতে হচ্ছে। যে সার আমরা ৪৫৬ ডলারে কিনতাম, তা এখন ৮০০ ডলারের বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ফলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বা নীতিগত পরিবর্তন আনার পরিসর সংকুচিত হয়েছে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমরা প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়িক পদ্ধতি সহজ করতে চাই। কয়েক দিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। আমাদের ৪৪ শতাংশ রপ্তানির গন্তব্য ইউরোপ। তারা অনেক অশুল্ক বাধার কথা বলেছে। আমি তাদের কথা দিয়েছি, আমরা সমস্যাগুলো সমাধান করব।’

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কর-জিডিপির অনুপাত নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এর কার্যকর সমাধান হয়নি। আমাদের বর্তমান করব্যবস্থা বৈষম্যমূলক। যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের ওপর করের বোঝা আরও বাড়ানো হয়; যাঁরা কর দেন না, তাঁরা আড়ালেই থেকে যান।’

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া ব্যবসায়ীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, উচ্চ সুদের হার, তারল্যসংকট ও কঠোর ঋণনীতির কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারাচ্ছেন। ফলে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের গতি কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতি ও ব্যাংক ভঙ্গুর

মাহবুবুর রহমান বলেন, হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের অর্ধেক ব্যাংকই দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে সাধারণত ‘ব্যাংকিং অ্যাক্ট’ বা দেউলিয়াসংক্রান্ত আইন ও নিয়মগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। সে কারণে এই খারাপ অবস্থার মধ্যেও ব্যাংকগুলো (রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ) এখনো টিকে আছে বা চলছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মনজুর হোসেন বলেন, বর্তমানে অর্থনীতি ভঙ্গুর ও মন্দা অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী বাজেটে এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়া। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ছাড়া আগামী অর্থবছরের ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

কেমন বাজেট হওয়া উচিত

অর্থনীতির বর্তমান হাল ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে আগামী অর্থবছরের বাজেট কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আলোকপাত করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারের ‘জনতুষ্টিমূলক’ বাজেট করা উচিত হবে না; বরং সরকারের উচিত, রক্ষণশীল রাজস্ব নীতি (বাজেট) ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। যদিও এতে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে প্রবৃদ্ধি বা কর্মসংস্থানে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় এটি জরুরি।

‘উইলফুল ডিফল্টার’ বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। তিনি বলেন, ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন দুর্নীতির কারণে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছেন। যাঁরা দুর্নীতি করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন, তাঁদের দায়ভার সাধারণ ব্যবসায়ীরা নেবে না।

বর্তমান সরকারের ওপর আগের সরকারের অনেক দায়ভার উল্লেখ করে রিজওয়ান রাহমান বলেন, এই সংকট কাটাতে দেদার টাকা ছাপানো যাবে না। টাকা ছাপিয়ে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বাড়ালেও প্রকৃতপক্ষে লাভ হবে না; বরং মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

ঢাকা চেম্বারে সাবেক সভাপতি ও সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হোসেন খালেদ বলেন, বাজারে অপ্রদর্শিত আয় আছে অনেক। সেগুলো কোনো নীতিমালা বা দণ্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগে আনা দরকার; তা না হলে এই অর্থ দেশের বাইরে চলে যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি মো. কাউসার আলম, বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) সভাপতি ডেভিড হাসনাত, কনফিডেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ইমরান করিম, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) পরিচালক শেখ মাসুদুল আলম, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ ও সামির সাত্তার প্রমুখ।