‘এই মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণের দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই’, বললেন অর্থমন্ত্রী, কেন বললেন

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীফাইল ছবি প্রথম আলো

বর্তমান পটভূমিতে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ।

বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে যে দুরবস্থায় অর্থনীতিকে পেয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে পারলে এলডিসি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

আজ রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই গত ফেব্রুয়ারি মাসে এলডিসি উত্তরণ পেছাতে জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। এরপর অর্থমন্ত্রী আজ এ কথা বলেন।

এলডিসি কী, কীভাবে উত্তরণ

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যারা একটু পিছিয়ে আছে, তাদের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় রাখে জাতিসংঘ। এসব দেশ যাতে এলডিসি উত্তরণ হতে পারে, সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নানা ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা দেওয়া হয়।

এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)।

তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কি না। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড অবশ্য পরিবর্তিত হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। তবে করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য দুই বছর সময় বাড়ানো হয়। এ বছরের (২০২৬ সাল) নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা ঠিক করা আছে।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত–সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে।

কেন পেছাতে চায় বাংলাদেশ

এ বিষয়ে আজ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতির অস্থিরতা কাটানোর জন্য সরকার সংকট মোকাবিলা করে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ মূল্যে জ্বালানি আমদানি করছে সরকার। ফলে বাংলাদেশের রিজার্ভে প্রভাব পড়ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছাড়াও দেশের অনেক ঋণ আছে। ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা বড় সমস্যা। ভবিষ্যতে ঋণ ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের অর্থায়নের চিন্তা করতে হবে।’

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করে এবং দেশের সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, কখন এলডিসি উত্তরণের দিকে যাওয়া হবে। জনগণের কাছে নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে যে ওয়াদা করা হয়েছে, তা সময়মতো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণসহ আমরা কিছু কাজ বাস্তবায়ন করেছি। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সক্ষমতা তৈরির পর আমরা এলডিসি উত্তরণের দিকে যাব। কিন্তু এই মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণের দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

উত্তরণ পেছাতে চিঠি

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে।

সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠান।

চিঠিতে দেশি–বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনার প্রক্রিয়া চলমান।