এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আবদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশি ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। আবার আমদানিও কমছে। সে কারণে দাম বাড়তি। ফলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে যাতে এ ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়, তার জন্য আমরা সরকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। অন্যথায় ফলের বাজার হারাতে হবে।’

বিদেশি ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। আবার আমদানিও কমছে। সে কারণে দাম বাড়তি।
শেখ আবদুল করিম, সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি

বাদামতলী বাজারে এখন মানভেদে এক কার্টন (১৮ কেজি) আপেল পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। কোরবানির ঈদের আগে দাম ছিল ২ হাজার ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা; অর্থাৎ ঈদের আগে ভালো মানের এক কেজি আপেলের পাইকারি দাম ছিল ১৬১ টাকা। এখন সেই আপেলই বিক্রি হচ্ছে ২১১ টাকায়। শুধু আপেল নয়, মাল্টা, আঙুর, আনার, নাশপাতি, বেবি ম্যান্ডারিন (চায়না কমলা) ও নাগফলের দামও বেড়েছে। পাইকারিতে এসব ফলের দাম কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা বাজারে দামটা আরও বাড়তি। বাজার থেকে খুচরায় এক কেজি আপেল কিনতে এখন ক্রেতাদের ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা গুনতে হচ্ছে। সুপারশপ বা বিশেষায়িত দোকানগুলোতে দাম আরও বেশি।

খুচরা বাজারে আপেল ছাড়া উল্লেখযোগ্যদাম বেড়েছে মাল্টা ও আনারের। ঈদের আগে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। বর্তমানে ২১০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে মাল্টা কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে ছোট ও বড় আনার কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। বড় আনার প্রায় ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঈদের আগেও এই ফলের দাম ছিল ৪০০-৪২০ টাকা কেজি।

শনিবার রাজধানীর পল্টন থেকে ফল কিনতে দেখা যায় বেসরকারি চাকরিজীবী মাসুদুর রহমানকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের আগে মাল্টা, আঙুর, আপেল যে দামে কিনেছিলাম, তার থেকে এখন কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়েছে। তাই কম কম কিনছি।’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টন তাজা ফল আমদানি হয়। তার আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৫ লাখ ৮৪ হাজার টন ফল। তার মানে, বিদায়ী অর্থবছরে ফলের আমদানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। আমদানি হওয়া তাজা ফলের বড় অংশই হচ্ছে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতি। বিদেশি ফলের সিংহভাগ আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই। আমদানিকারকেরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে ফলের আমদানি আরও কমবে।

বাদামতলীর ফল আমদানিকারক ও তাহমিদ আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হুমায়ূন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুল্ক তো বেড়েছেই। আবার ব্যাংকে শতভাগ মার্জিন দিয়ে ঋণপত্র খুলতে হচ্ছে। এতে আমদানি কমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশ। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ফলের দাম বাড়তি।’

২০২১ সালে আমদানির হিসাব অনুযায়ী, দেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৬ লাখ ৮৮ হাজার কেজি বিদেশি ফল খায়। আর খুচরা মূল্যে প্রতিদিন ফল বেচাকেনা হচ্ছে কমবেশি ২৭ কোটি টাকার। ধারণা করা হয়, দেশে খুচরা পর্যায়ে বছরে ফলের বাজারের আকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিদেশি ফলের চাহিদা বেশি থাকে। কারণ, এ সময়ে দেশীয় ফলের সরবরাহ থাকে কম। আম, লিচু, তরমুজের মৌসুমে অবশ্য বিদেশি ফলকে হটিয়ে একচেটিয়া রাজত্ব চলায় দেশীয় সুস্বাদু এসব ফল।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী, আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুরের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩ শতাংশ এবং অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট বা এটিভি ৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট করভার দাঁড়ায় ৮৯ শতাংশ। এরপর চলতি বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে এনবিআর নতুন করে আরও ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসিয়েছে। অবশ্য দেশে যে ফল বেশি উৎপাদিত হয়, সেটার ওপর কর তুলনামূলক কম। যেমন পেয়ারা আমদানির ওপর মোট করভার ৫৯ শতাংশ। কিন্তু দেশের চাষিরাই বিপুল পেয়ারা উৎপাদন করেন।

ফল আমদানিকারকেরা বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ভারত, ভুটান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মিসর, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেজুর আমদানিও বেড়েছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন