বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করল এসঅ্যান্ডপি

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিপ্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ বহাল রাখা হয়েছে।

সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা, জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা ও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকির কারণে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি আরও কমে যেতে পারে। এসব কারণে পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ করা হয়েছে।

এসঅ্যান্ডপির মতে, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে সাড়ে ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিবাজারের অনিশ্চয়তা ও তৈরি পোশাক রপ্তানির অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে প্রবৃদ্ধির গতি সীমিত থাকবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, তৈরি পোশাক খাতের পুনরুদ্ধার ও বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক সহায়তা বাংলাদেশের বৈদেশিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন আইএমএফ কর্মসূচির কল্যাণে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ত্বরান্বিত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দুর্বলতা ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে আগামী কয়েক বছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এখনো জিডিপির ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার, ই-ট্যাক্স ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও কর প্রশাসনের উন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে।

ব্যাংক খাত সম্পর্কে এসঅ্যান্ডপি বলেছে, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামি ব্যাংকগুলোতে মূলধনঘাটতি এবং অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। বোঝা যাচ্ছে, এসব ব্যাংকের পুনর্মূলধনীকরণে অনেক সময় লাগবে।

আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে উল্লেখযোগ্য গতি আসবে—এমন সম্ভাবনা দেখছে না এসঅ্যান্ডপি। সে কারণে দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি একই পর্যায়ের মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর সমপর্যায়ে নেমে এলে বাংলাদেশের ঋণমান আরও কমানো হতে পারে।

এ ছাড়া বৈদেশিক খাতের অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে ঋণমান কমার ঝুঁকি আছে। উদাহরণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, চলতি হিসাবের আয়ের তুলনায় নিট বৈদেশিক ঋণ যদি ধারাবাহিকভাবে ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, তাহলেও ঋণমান কমতে পারে।

এসঅ্যান্ডপির মতে, যেসব কারণে বাংলাদেশের ঋণমানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রত্যাশার তুলনায় চলতি হিসাব থেকে কম বৈদেশিক আয়; পূর্বাভাসের চেয়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেশি হওয়া; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি না পাওয়া।

এসঅ্যান্ডপির মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এ পরিস্থিতিতে চলমান পুনরুদ্ধারের গতি আরও কমে যেতে পারে।

সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের অভিঘাত থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে। কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদের নিম্নমান ও খেলাপি ঋণের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছে। এর ইতিবাচক প্রভাব এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।

একই সময়ে জ্বালানিবাজারের অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ব্যক্তির ভোগ ব্যয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। চাহিদা বৃদ্ধি না পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ভোগভিত্তিক যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, তাতে গতি আসছে না।

এসঅ্যান্ডপি বলছে, বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র কত শুল্ক আরোপ করবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়।

এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশের বেশির ভাগ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮৫ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। বাস্তবতা হলো, শুল্ক নিয়ে এ অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।

দেখা যাচ্ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অভ্যন্তরীণ ভোগ যেমন বাড়ছে না, তেমনি রপ্তানিতেও আছে শুল্কজনিত অনিশ্চয়তা। প্রবৃদ্ধির পালে হাওয়া লাগার সম্ভাবনা কম।

সে কারণেই এসঅ্যান্ডপি বলেছে, আগামী তিন বছর দেশের প্রবৃদ্ধির হার অতটা বাড়বে, তারা সেটা মনে করছে না।