মুড়িকাটা ও হালি পেঁয়াজ কী, কীভাবে চিনবেন

মুড়িকাটা ও হালি পেঁয়াজছবি: প্রথম আলো

বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে অনেক সময় বিক্রেতার মুখে শোনা যায়—এটা মুড়িকাটা পেঁয়াজ, আর ওইটা হালি পেঁয়াজ। দামেও থাকে পার্থক্য। কিন্তু এই দুই ধরনের পেঁয়াজ সম্পর্কে অনেকের পরিষ্কার ধারণা নেই।

কৃষিবিশেষজ্ঞরা জানান, বীজ থেকে চারা গজিয়ে নতুন পেঁয়াজ উৎপাদন করা যায়; আবার পুরোনো পরিপক্ব পেঁয়াজ (কন্দ বা বাল্ব) থেকেও নতুন পেঁয়াজ উৎপাদন করা যায়। মূলত কন্দ ও চারা (হালি)—এই দুই পদ্ধতিতেই দেশে পেঁয়াজ চাষ হয়। পেঁয়াজগাছ লাগানো তথা উৎপাদনের এই পদ্ধতিগত ভিন্নতার বিষয়টিই পেঁয়াজকে মুড়িকাটা ও হালি হিসেবে আলাদা করে।

হালি পেঁয়াজ দেখতে অনেকটা গোলাকৃতির। অন্যদিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ পুরোপুরি গোলাকৃতি নয়, শাঁসের একটি অংশ পেঁয়াজে থাকে।

মুড়িকাটা পেঁয়াজ কী

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, কন্দপদ্ধতিতে পরিপক্ব পেঁয়াজ বিশেষ উপায়ে রোপণ করা হয়। এর মাধ্যমে পরিপক্ব পেঁয়াজের মূল থেকে নতুন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এ কারণে এটিকে মূলকাটা পেঁয়াজ বলে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘মুড়িকাটা পেঁয়াজ’ নামেই বেশি পরিচিত।

মুড়িকাটা পেঁয়াজ মূলত আগাম রবিশস্য হিসেবে চাষ করা হয়। ফলে এটি বাজারে মৌসুমের শুরুতেই চলে আসে। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ করা হয়। নতুন এ পেঁয়াজ ডিসেম্বর মাসে হাটে উঠতে শুরু করে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে বাজারে বিক্রি হয়।

সাধারণত, নভেম্বর মাসের দিকে বাজারে পুরোনো পেঁয়াজের সরবরাহ কমতে থাকে এবং নতুন পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কৃষকেরা আগাম তথা মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আনেন। বর্তমানে বাজারে যেসব নতুন পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো মুড়িকাটা পেঁয়াজ।

হালি পেঁয়াজ কী

কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, পেঁয়াজ উৎপাদনের অপর পদ্ধতিতে প্রথমে বীজ থেকে চারা তৈরি করা হয়। এরপর সেই চারাগাছ রোপণ করে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এ ধরনের পেঁয়াজকে বলা হয় হালি পেঁয়াজ। হালিপদ্ধতিতে পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয় ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে। নতুন এই পেঁয়াজ হাটে ওঠে মার্চ-এপ্রিলে। এরপর তা কৃষক ও আড়তদারেরা বছরের অন্য সময়ের জন্য সংরক্ষণ করেন। মৌসুমের শুরুতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের প্রাধান্য থাকলেও বছরের অধিকাংশ সময় হালি পেঁয়াজই বিক্রি হয়।

মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় তা অনেকটা অপরিপক্ব থাকে, অর্থাৎ ভেতরে বেশি পানি বা কাঁচা থাকে। এই পেঁয়াজের গলার অংশ কেটে বাজারে আনেন কৃষকেরা। ফলে ভেতরের অংশ সহজেই বাইরের বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসে। এতে ছত্রাক ও জীবাণু ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং পেঁয়াজ দ্রুত পচে যেতে পারে।

অন্যদিকে, হালি পেঁয়াজ জমি থেকে তোলার পর তা ছায়ায় রেখে শুকানো হয়। এতে গলার অংশ শক্ত ও শুকনো হয়ে যায়, যা পেঁয়াজের ভেতরের অংশকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা দেয়। ফলে বাতাস ও আর্দ্রতা সহজে ঢুকতে পারে না এবং পেঁয়াজ দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

দামের পার্থক্যের কারণ

কৃষকেরা জানান, মৌসুমের শুরুতে পুরোনো পেঁয়াজের সরবরাহ কমে যায় এবং আগাম পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকে। ফলে মুড়িকাটা পেঁয়াজ তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়। এ কারণে অনেক কৃষক মৌসুমের শুরুতে এ পেঁয়াজ চাষ করেন, তবে তা পরিমাণে কম। যেমন, দেশে পেঁয়াজের অন্যতম উৎপাদনস্থল পাবনা জেলায় এ বছর ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে মাত্র ৯ হাজার হেক্টরে।

অন্যদিকে, হালি পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। আড়তদার ও বড় ব্যবসায়ীরা এই পেঁয়াজই বেশি পরিমাণে কিনে থাকেন। সরবরাহ বাড়লে এই পেঁয়াজের দাম কমে। আবার সরবরাহ সংকট হলে দাম বেড়ে যায়। বছরের শেষ দিকে, অর্থাৎ নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ মৌসুম শুরুর আগে অনেক সময় প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

বর্তমানে রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন মৌসুমের হালি পেঁয়াজ বাজারে আসতে আরও অন্তত দেড়-দুই মাস সময় লাগবে। তবে কিছু দোকানে স্বল্প পরিমাণে গত মৌসুমের পুরোনো হালি পেঁয়াজ পাওয়া যায়। এগুলোর কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা বা এর চেয়ে বেশি।

ব্যবসায়ীরা জানান, অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ব্যবহার করলে মুড়িকাটা পেঁয়াজ কেনা যেতে পারে। তবে কেউ যদি বেশি পরিমাণে কিনে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তাদের হালি পেঁয়াজ কেনাই নিরাপদ।