বাংলাদেশের যেসব পরিবারের সদস্য বিদেশে কাজ করতে যান, তাঁরা তুলনামূলক কম দারিদ্র্যের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। করোনার সময়েও এই পরিবারগুলো ভালোভাবে ধাক্কা সামলাতে পেরেছে। তবে অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা (দেশের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত) নানা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
দেশের অভিবাসী পরিবারগুলোর ওপর কোভিড-১৯ মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ে করা এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন।
আজ রোববার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের সমাপনী দিনে এ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
সমাপনী দিনের শুরুতে এ–সংক্রান্ত কর্ম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের জাতীয় প্রোগ্রাম ম্যানেজার রাহনুমা সালাম খান। আলোচক ছিলেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ মর্তুজা আসিফ এহসান।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ অভিবাসী পরিবারের তুলনায় আন্তর্জাতিক অভিবাসী পরিবারগুলোর দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। কারণ, তাদের আয় বেশি। গবেষণার তথ্য উপস্থাপনকালে মাহতাব উদ্দিন বলেন, প্রবাসী আয় অভিবাসী পরিবারের জন্য একটি ঢাল বা সুরক্ষার মতো কাজ করে। এমনকি দ্রব্যমূল্য বাড়লেও তারা সেই ধাক্কা সামলে নিতে পারে এবং তাদের খাবারের মান ও পুষ্টির নিশ্চয়তা অন্যদের চেয়ে বেশি থাকে।
দুর্যোগ দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ায়
অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের স্থানান্তর (মাইগ্রেশন) নিয়ে আরেকটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো আজরীন করিম। বিশ্বব্যাংক ও বিআইডিএসের যৌথ অর্থায়নে উপকূলীয় অঞ্চলের ৪০৩টি পরিবারের ওপর এ জরিপ করা হয়। জরিপের প্রাথমিক ফলাফল অনুসারে, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হঠাৎ আসা দুর্যোগের ক্ষেত্রে আংশিক অভিবাসনের হার বেশি (প্রায় ৪০ শতাংশ)। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সক্ষম সদস্যরা কাজের সন্ধানে বাইরে গেলেও অন্যরা ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকেন। অন্যদিকে নদীভাঙনের মতো ধীরগতির দুর্যোগ মানুষকে পূর্ণ অভিবাসনের দিকে ঠেলে দেয়। নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলো যখন সব হারায়, তখন তারা সপরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। এটি দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, যারা আগে থেকেই কৃষিকাজের বাইরে অন্য ছোটখাটো ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানে জড়িত ছিল, তাদের মধ্যে স্থানান্তরের প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে অকৃষি খাতের দিনমজুরেরা ধীরগতির দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। নারীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজের খোঁজে অন্য জায়গায় চলে গেলে (আংশিক অভিবাসন) নারীরা স্থানীয়ভাবে কৃষি ও পশুপালনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অভিবাসীদের মধ্যে যাঁরা আয়বর্ধক কাজে (যেমন পোলট্রি, মাছ চাষ বা সবজি চাষ) যুক্ত হতে পেরেছেন, তাঁদের আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা কম। তাঁরা মনে করেন, অভিবাসী এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে তাঁরা নতুন করে জীবন গড়তে পারবেন। অন্যদিকে যাঁরা অস্থায়ীভাবে অভিবাসী হয়েছেন, তাঁরা মূলত জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং শিকড়ের টানে আদি নিবাসে ফিরে যেতে চান।
বিআইডিএসের গবেষক আজরীন করিম বলেন, হঠাৎ আসা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সরকারি নীতি থাকলেও নদীভাঙন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ধীরগতির দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর নীতির অভাব রয়েছে।
অধিবেশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক রিপন রায় প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ ও ‘ডাচ ডিজিজ’ নিয়ে একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে প্রবাসী আয় বাড়লে অর্থনীতিতে ‘ডাচ ডিজিজ’ হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই প্রবণতা দেখা যায়নি।
‘ডাচ ডিজিজ’ একটি অর্থনৈতিক ধারণা। এই তত্ত্ব অনুসারে, কোনো দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানি, রেমিট্যান্স বা বিদেশি সহায়তার কারণে হঠাৎ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে স্থানীয় মুদ্রা শক্তিশালী হয়। তাতে বিদেশে পণ্য রপ্তানি ব্যয়বহুল হয় এবং রপ্তানিকারকেরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারান। কিন্তু গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রবাসী আয় বাড়লেও তা এখন পর্যন্ত রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে না।
বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের টাকা কেবল ভোগের পেছনে ব্যয় হয় না জানিয়ে রিপন রায় বলেন, ‘প্রবাসী আয়ের টাকা ক্যাপিটাল অ্যাকুমুলেশন বা মূলধন হিসেবে সঞ্চিত হচ্ছে। এই অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ফলে মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি আমাদের রপ্তানি সক্ষমতার জন্য কোনো হুমকি নয়।’ বরং প্রবাসী আয়কে আরও কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যায়, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।