আগামী বাজেটের জন্য ধ্রুবতারা হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ‘ধ্রুবতারা’ বা মূল লক্ষ্য ধরা উচিত হবে।
এ সময় বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন আগামী অর্থবছরের বাজেটকে একটি ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একদিকে অমীমাংসিত কাঠামোগত সংস্কারের অভাব এবং প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতি, অন্যদিকে আইএমএফের শর্ত ও জনগণের উচ্চাশা—এই চতুর্মুখী চাপের মুখে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের ‘ধ্রুবতারা’ বা মূল লক্ষ্য করা উচিত হবে।
আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত সোনারগাঁও হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধির পথে ফেরার জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোয় একটি ‘অ্যাঙ্কর’ বা নোঙর প্রয়োজন বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতিকে ধ্রুবতারা হিসেবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় রাখাটা এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাজেটঘাটতি হবে অন্যতম নোঙর। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেটঘাটতি কোনোভাবেই মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ৪ শতাংশের ওপর যাওয়া ঠিক হবে না।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বছরের বড় অঙ্কের রাজস্বঘাটতি মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্য মন্ত্রী দিয়েছেন, তা অর্জনে নতুন ক্ষেত্রে করজাল বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
বাজেটঘাটতি কমাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ যেন না কমে, সে বিষয়ে সতর্ক করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অনেক ‘সুইটহার্ট ডিল’ বা অল্প বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা আছে।
করছাড় ও ভর্তুকি সংস্কার
বাজেটঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমানোর কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বর্তমানে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ করছাড় দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যেমন কৃষি আছে, তেমনি বড় বড় করপোরেট খাতও আছে। তিনি নির্দিষ্ট খাতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, করপোরেট আয়করে বর্তমানে ২৫ হাজার কোটি টাকার ওপর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে এই ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। আবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ছাড় দেওয়া আছে ৭ হাজার ৬১১ কোটি টাকার মতো।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচিত হবে এই করছাড়ের জায়গাগুলো ভালো করে ‘ঝেড়ে-মুছে’ দেখা। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে যে বিশাল করছাড় দেওয়া হচ্ছে, তা পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ আছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে শুধু আয়করের ওপর নির্ভর না করে সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর দাবি জানান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, পৃথিবীতে কোনো দিন শুধু আয়কর দিয়ে বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি। এর জন্য সম্পদ কর লাগে। মধ্যবিত্তের বাধা আসার ভয়ে জনপ্রিয়তা হারানোর চিন্তা করলে চলবে না। এ ছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ওপর ‘ইনহেরিট্যান্স ট্যাক্স’ থাকা উচিত, কারণ, এটি একটি ‘আন-আর্নড ইনকাম’ বা বিনা পরিশ্রমে পাওয়া সম্পদ। এর সপক্ষে একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা জরুরি।
মাঝারি মাত্রার ঋণের সংকটে বাংলাদেশ
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘মডারেট ডেট ডিস্ট্রেস’ বা মাঝারি মাত্রার ঋণের সংকটে ঢুকে গেছে। বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনা এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বৈদেশিক দায় পরিশোধে এখন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের চেয়েও দ্বিগুণ টাকা চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
রাজস্ব বৃদ্ধির বিকল্প উৎস হিসেবে সরকারের হাতে থাকা বহুজাতিক ও লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে ছাড়ার পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের আমল থেকেই এই আলোচনা চলছে। এমনকি সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি যদি এটি করতে না পারেন, তবে আর কে পারবেন? মূলত আমলাদের পক্ষ থেকে একধরনের প্রতিরোধের কারণে এটি সম্ভব হয় না, কারণ, ওই সব প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ সভায় বসে তাঁরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।