আইএমএফের নতুন ঋণ ৪৫০ কোটি ডলার, চুক্তি হতে পারে ডিসেম্বরে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)ছবি: রয়টার্স

পুরোনো ঋণ বাতিলের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাচ্ছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক আলোচনা চলছে। নতুন কর্মসূচির মেয়াদ হবে তিন বছর।

আগামী ডিসেম্বর মাসে নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি হতে পারে। এখন শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। শর্তের মধ্যে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আগামী সোমবার থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় সাত দিনব্যাপী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় যোগ দেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরবর্তী ঋণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এসব সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা করা সময়ের অপচয়। এসব সংস্কার জাতীয় স্বার্থেই করতে হবে। আইএমএফের মতো সংস্থা থাকলে একটি সময়সীমা থাকে, সংস্কারের চাপ থাকে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

এর আগে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি অনুমোদন করে আইএমএফ। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ঋণসহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেই ঋণের ৭ কিস্তির মধ্যে ৫ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ঋণ কর্মসূচির আকার ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।

কিন্তু পরিবর্তিত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় তা জানিয়ে দেয় সরকার। গত ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য চিঠি দেয় সরকার। তখন আইএমএফের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, ভর্তুকি কমানোসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি এগোয়নি। সেই একই ধরনের সংস্কারের কথা এবারও বলবে আইএমএফ। তাদের অবস্থানের পরিবর্তন তো হবে না। একই ধরনের সংস্কারের অগ্রাধিকারের কথা দেশের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। এসব সংস্কার করতেই হবে।

আরও পড়ুন

জাহিদ হোসেন হোসেন আরও বলেন, এসব সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা করা সময়ের অপচয়। এসব সংস্কার জাতীয় স্বার্থেই করতে হবে। আইএমএফের মতো সংস্থা থাকলে একটি সময়সীমা থাকে, সংস্কারের চাপ থাকে। তিনি জানান, রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি নেই, খরচের চাপ সামলাতে দেশি–বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ বাড়ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব শর্ত পুরোনো ঋণ কর্মসূচিতেই ছিল। কিন্তু সেই শর্ত পূরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। ওই সময়সীমায় এসব সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। নতুন ঋণের ক্ষেত্রে এসব সংস্কার করতে বাড়তি সময় পাওয়া যাবে।

নতুন ঋণের শর্ত

নতুন ঋণ কর্মসূচির বেশ কিছু শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত মে মাসে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কখনো সশরীরে বৈঠক হয়, কখনো ভার্চ্যুয়াল উপায়ে বৈঠক করে উভয় পক্ষ। শর্তগুলোর মধ্যে সংস্কারই প্রাধান্য পেয়েছে।

শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া; রাজস্বনীতি ও আদায় আলাদা করা; করছাড় যৌক্তিক করা; দেউলিয়া আইন করা; সরকারের ভর্তুকি কমানো।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব শর্ত পুরোনো ঋণ কর্মসূচিতেই ছিল। কিন্তু সেই শর্ত পূরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। ওই সময়সীমায় এসব সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। নতুন ঋণের ক্ষেত্রে এসব সংস্কার করতে বাড়তি সময় পাওয়া যাবে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এই ঋণ নিয়ে বৈঠক হবে। আগামী নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে বলে জানা গেছে। ওই সফরেই ঋণের সংস্কার ও শর্ত চূড়ান্ত হবে। চূড়ান্ত দর-কষাকষি শেষে আগামী ডিসেম্বর মাসে ঋণচুক্তি হতে পারে।

গত মে মাসে যখন নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার, তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পুরোনো কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত দেশি প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।

পুরোনো ঋণ বাতিল হলো কেন

পুরোনো ঋণের আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো ৫৫০ কোটি ডলারের সব কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা ছিল। সেই ঋণের কিস্তি পেতে কিছু সংস্কার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার শর্তও দিয়েছিল আইএমএফ। অনেক সংস্কার সময়মতো হয়নি।

যেমন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও আদায় বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বিষয়টি পর্যালোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি এখনো প্রতিবেদন দেয়নি।

২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে যৌক্তিকভাবে সব ধরনের করছাড় বাদ দেওয়ার শর্ত ছিল। সেটিও তেমন একটা এগোয়নি। আবার প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আধা শতাংশের সমান অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের কথা ছিল, তা–ও হয়নি।

এ দিকে ব্যাংক খাতে বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্তও পূরণ হয়নি। তবে ব্যাংক খাতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন হয়েছে, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। কিন্তু জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো বা যৌক্তিক করায় তেমন একটা অগ্রগতি হয়নি; বরং ভর্তুকি বেড়েছে।

আরও পড়ুন

গত মে মাসে যখন নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার, তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পুরোনো কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত দেশি প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়। সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং বাস্তবসম্মত, ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আগ্রহী।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, আরও হবে। আমরা নতুন ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চাইছি, ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। আশা করছি এবারের বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে ভালো অগ্রগতি হবে। এর আগে আইএমএফের ঋণবিষয়ক অর্থমন্ত্রীর এক বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে, যা হতাশাজনক।’