উন্নয়নকে অর্থনীতির গণ্ডি থেকে বের করেছেন অমর্ত্য সেন

অমর্ত্য সেন

১৯৩০ ও ৪০-এর দশক পর্যন্ত উন্নয়ন বলতে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই বোঝানো হতো। মোট দেশজ উৎপাদন, মাথাপিছু আয়—এই সবই ছিল উন্নয়নের মাপকাঠি। এর বাইরেও যে উন্নয়নের মাপকাঠি থাকতে পারে, তার সন্ধান দেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মাপকাঠিতে যে উন্নয়নের পরিমাপের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই পদ্ধতির বদৌলতে জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচক প্রণয়ন করে থাকে।

জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচকে পরিসংখ্যানগতভাবে কোনো দেশের মানব উন্নয়নসংক্রান্ত তথ্যাদি তুলে ধরা হয়। উচ্চমাত্রার মানব উন্নয়ন সূচকের সঙ্গে উন্নত দেশের ভবিষ্যতের অর্থনীতির গতিধারা গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেখানে একটি দেশের আর্থিক আয় কিংবা উৎপাদনশীলতার চেয়ে অন্যান্য বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাথাপিছু মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কিংবা মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি আয়ের কতটুকু অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়িত হয়েছে, তা-ও তুলে ধরা হয়।

অমর্ত্য সেনের অর্থনৈতিক চিন্তায় অ্যাডাম স্মিথ ও কার্ল মার্ক্সের প্রভাব দেখা যায়। তিনি একদিকে বাজারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, অন্যদিকে সেই বাজার নিয়ন্ত্রণের কথাও বলেন। তিনি মনে করেন, গরিব মানুষের স্বার্থে বাজারে হস্তক্ষেপ করতেই হবে।

গতকাল সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ ও ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘অমর্ত্য সেনের চিন্তা এবং অর্থনীতি ও দর্শনে তাঁর অবদান’ শীর্ষক ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ এস আর ওসমানী।

অমর্ত্য সেন অর্থনীতির পাশাপাশি দর্শনচর্চাও করেন। ন্যায্যতা নিয়ে তিনি অনেক লিখেছেন। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রে তাঁর অগাধ বিশ্বাস। এস আর ওসমানী বলেন, অমর্ত্য সেন সবকিছুর মীমাংসা করতে চান গণবিতর্কের মধ্য দিয়ে। বিতর্ক বা আলোচনার মধ্য দিয়ে সবাই একমত হতেও পারেন, আবার না–ও হতে পারেন। এর কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। সবাই একমত না হলেও সমাধানের কোনো পদ্ধতি বের হয়ে আসবে। এটাকেই বলা হয় সোশ্যাল চয়েস থিওরি বা সামাজিক নির্বাচন তত্ত্ব। অমর্ত্য সেন এই তত্ত্ব নিয়ে অনেক কাজ করেছেন।

দেশভাগ, দাঙ্গা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ—এ রকম বড় এক পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে অমর্ত্য সেনের চিন্তা গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন বক্তারা। দেশভাগের সময় যে সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষ হয়, বালক অমর্ত্য সেনের কোমল মনে তার গভীর রেখাপাত হয়। সে জন্য দেখা যায়, তিনি সারা জীবন দরিদ্র মানুষের পক্ষে কাজ করেছেন। যে দাঙ্গা তিনি দেখেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে আস্থা রেখেছেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান এম এম আকাশ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম।