গণবক্তৃতায় ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
উন্নয়নে বাধা অদক্ষ বাজার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস স্টাডি সেন্টার আয়োজিত ‘চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনীতি সম্মেলন’ শুরু হয়েছে গতকাল।
অদক্ষ ও অসম্পূর্ণ বাজারকে উন্নয়নের পথে বাধা বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, চারপাশে যত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে দেখে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের পক্ষেও নোবেল পুরস্কার পাওয়া সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস স্টাডি সেন্টার আয়োজিত ‘চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনীতি সম্মেলন’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গতকাল বৃহস্পতিবার দেওয়া গণবক্তৃতায় ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অতনু রব্বানী।
২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত আট দিনব্যাপী এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তনের জন্য অর্থনীতি’। জুম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গণবক্তৃতার পাশাপাশি নির্ধারিত আলোচনা, নীতি বিতর্ক, গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন, রচনা প্রতিযোগিতা ও স্পিকোনমিকস নিয়ে এবারের সম্মেলন সাজানো হয়েছে। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের গণবক্তৃতার বিষয় ছিল ‘সীমানা পেরোনো অর্থনীতি: সম্ভাবনা ও বিপত্তি।’
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে আমরা পশ্চিমা বই ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের দেশেই যে বিচিত্র বাজার রয়েছে, গ্রামীণ বাজার থেকে শপিং মল—এসব নিয়ে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ রয়েছে। ভারতের বিখ্যাত অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী শাবানা আজমি একবার বলেছিলেন, ভারতের মানুষ একই সঙ্গে তিন শতাব্দীতে বসবাস করে। আমাদের বাজারের ব্যাপারটাও অনেকটা এ রকম।’
যথার্থ তথ্য না থাকাও অদক্ষ বাজারের বৈশিষ্ট্য বলে জানান ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। বলেন, ভারতের দিল্লিতে একসময় দুধে খুব পানি মেশানো হতো। জানাজানি হওয়ার পর ক্রেতারা ঝুঁকি নিয়েই দুধ কিনতেন কিন্তু দাম কম দিতেন। একপর্যায়ে আরও বেশি পানি মেশানো হতো এবং ক্রেতারা আরও কম দাম দিতেন। বিষয়টার সমাধান হয়েছিল আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ল্যাক্টোমিটার ব্যবহারের মাধ্যমে।
দেশে আম, লিচু, কলার মতো ফল পাকার আগেই যে ক্ষতিকর কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয়, তার পেছনেও বাজার রয়েছে বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন সূচক দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিমাপ করা হয়। কিন্তু কোন দেশ কীভাবে টেকসই উন্নয়নের পথে যেতে পারে, তা নিয়ে অর্থনীতি কিছু বলে না। ১৯০০ সালে আর্জেন্টিনা ও জাপানের অবস্থা একই ধরনের ছিল। এত বছর পর দুই দেশের আজ কত বড় পার্থক্য! আবার বিশ্বে এত বৈষম্য ও অর্থসংকট, অথচ অর্থনৈতিক তত্ত্বে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু তাই নয়, অর্থনীতি কাজ করে মানুষের স্বার্থচিন্তা নিয়ে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এভাবে বললে শিক্ষার্থীরা মন খারাপ করতে পারে। তবে এটা তো ঠিকই যে অর্থনীতিতেও স্বার্থপরতা আছে। এটা একটা সহজাত প্রবণতা এবং অর্থনীতি সব আচরণের দিকে তাকায় না।
উদাহরণ দিতে গিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রশ্ন তোলেন, ‘বাজারে গিয়ে কোনো ক্রেতা যদি গরিব বিক্রেতার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বাজারদরের চেয়ে বেশিতে পণ্য কিনতে চান অথবা ক্রেতাকে গরিব মনে করে যদি বিক্রেতা কম দামে পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে কি বাজার চলত?’ তিনি বলেন, নিউরোসায়েন্সেও দেখা গেছে, মস্তিষ্কের যে অংশে আর্থিক বিষয় কাজ করে, সে অংশটিতে উদারতার বিষয় কম।