বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
বাজেট ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব
দেশের শীর্ষস্থানীয় তিন ব্যবসায়ী সংগঠন নতুন বাজেটে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে। তবে এই বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন বলেও উল্লেখ করেছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় চেম্বারগুলো ২০২১–২২ অর্থবছরের বাজেটকে জনকল্যাণমুখী এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বলে আখ্যায়িত করেছে। তাদের মতে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও জনগণের চাহিদা, জীবন-জীবিকা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো আরও সুদৃঢ় করা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলোকে বাজেটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ জন্য চেম্বারগুলো সরকারের প্রশংসা করেছে।
একই সঙ্গে তারা কোভিডের পরিস্থিতিতেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখায় সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে তারা বলেছে, বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির (৭.২%) লক্ষ্যমাত্রা আশাব্যঞ্জক এবং এটি অর্জন সম্ভব। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জনও কঠিন হবে। তাই বাজেটের সঠিক বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী নতুন বাজেটে করপোরেট কর ২.৫% কমানোর প্রস্তাব দেওয়ায় তাঁকে স্বাগত জানিয়েছে চেম্বারগুলো।
এমসিসিআই
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) মনে করে, এবারের বাজেট গতানুগতিক নয়। এতে ঘাটতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে চিন্তা না করে যুক্তিসংগতভাবে জনগণের স্থিতিশীল জীবন ও জীবিকার দিকে মনোযোগ দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই বাজেট অনেক দিক থেকে সাহসী ও অগ্রগামী।
তবে সংগঠনটি এ–ও বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দের আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনার পুরো সুবিধা যদি অর্জন করতে হয়, তাহলে সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন ও সরকারি ব্যয়ের মান নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া তিন মাস পরে বাজেটের অন্তর্বর্তী মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তখন যদি প্রয়োজন হয়, তবে বাজেট পুনর্গঠন ও সংশোধন করতে হবে।
শীর্ষ এই ব্যবসায়ী সংগঠন বাজেটে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাবকে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে একটি সঠিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে। বাজেটে অগ্রিম মূল্য সংযোজন কর কমানোর পরিকল্পনাকে ব্যবসাবান্ধব বলে মনে করে এমসিসিআই। এ জন্য সরকারের প্রশংসা করেছে সংগঠনটি।
১০ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়ায় এমসিসিআই সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, যারা আইন মেনে কর প্রদান করে, তাদের আরও বেশি কর দিতে হবে। অন্যদিকে যারা কর দেয় না, তারা এই বলয় থেকে বেঁচে যাবে।
বাজেটে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে জোর দেওয়ায় সরকারের প্রশংসা করেছে এমসিসিআই। সেই সঙ্গে জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্যও সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
এমসিসিআই মনে করে, ব্যক্তিগত কর রেয়াতের জন্য সর্বাধিক বিনিয়োগের সীমা দেড় কোটি থেকে এক কোটি টাকা করায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নারী উদ্যোক্তাদের এসএমই ব্যবসায়ে করমুক্ত লেনদেনের সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত করাকে সংগঠনটি সঠিক পদক্ষেপ মনে করে।
এফআইসিসিআই
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) বাজেটে করপোরেট আয়কর আড়াই শতাংশ হ্রাস, অগ্রিম কর (এটি) ৪% থেকে ১% কমিয়ে ৩%–এ এবং সিমেন্ট খাতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৩% থেকে ২%–এ নামিয়ে আনায় সরকারের প্রশংসা করেছে।
এফআইসিসিআই বাজেটে নেওয়া কিছু পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। যেমন স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতকে গুরুত্ব প্রদান, ভ্যাট–সংক্রান্ত জরিমানা দুবার থেকে কমিয়ে একবার করা, নির্বাচিত কিছু আইটি খাতে কর অব্যাহতি, ন্যূনতম করহার দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
সংগঠনটি বাজেটে বিবেচনার জন্য কিছু সুপারিশও করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, সাধারণ খাতের তুলনায় করপোরেট করহার আরও যৌক্তিকীকরণ, ই-কমার্সনির্ভর ব্যবসায় কর প্রণোদনা সুবিধা প্রদান, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর (এটি) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণ ইত্যাদি।
বাংলাদেশ চেম্বার
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) মনে করে, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারী বৃহৎ শিল্পে (অটোমোবাইল) ২০ বছর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ১০ বছর এবং হালকা প্রকৌশল খাতে যন্ত্রাংশ উৎপাদনে ১০ বছর কর অব্যাহতি প্রদান করায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, এটি দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি খাতসহায়ক বাজেট।
তবে বিসিআই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূলধনি যন্ত্রাংশ আমদানিতে আরোপিত ১%–এর অতিরিক্ত সব শুল্ক-কর মওকুফের দাবি জানিয়েছে।
বিসিআই মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হবে।
সংগঠনটি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের জন্য এবং হাসপাতাল স্থাপনে ১০ বছর কর অব্যাহতি প্রদান করায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানায়। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর ১৫% কর আরোপের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে বিসিআই।