ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজ্জাকের মাসিক আয় প্রায় লাখ টাকা

পিকেএসএফের রেইজ প্রকল্পের অধীনে ওস্তাদ (প্রশিক্ষক) রবি গমেজ তাঁর ইলেকট্রিক দোকানে তরুণদের হাতে-কলমে বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কাজ শেখানছবি: প্রথম আলো

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাহাড়পুর রোডের একটি ইলেকট্রিক দোকান। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আবদুর রাজ্জাক। গত ৩০ জুলাই দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট দোকানটিতে বেশ কয়েকটি পুরোনো ফ্রিজ দাঁড় করিয়ে রাখা। এ ছাড়া রয়েছে তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), কয়েকটি ফ্যান আর একটি ওয়াশিং মেশিন। এর মধ্যে একটি ফ্রিজের পেছনের অংশে মেরামতের কাজ করছেন আবদুর রাজ্জাক। আর তাঁকে সহায়তা করছিলেন একজন সহকারী।

আবদুর রাজ্জাক নিজে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি; মূলত এসি, ফ্রিজ প্রভৃতি যন্ত্র সারাই করেন। কথায় কথায় জানতে পারলাম, তিন বছর আগেও তাঁর দৈনিক আয় ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। দিনমজুরি করে তিনি এ আয় করতেন। তা–ও প্রতিদিন কাজ মিলত না। ২৭ বছর বয়সী সেই তরুণের মাসিক আয় এখন লাখ টাকার কাছাকাছি। আবদুর রাজ্জাক আগে জনে জনে কাজের খোঁজ করতেন; এখন তাঁর দোকানেই নিয়মিত কাজ করছেন ছয়জন কর্মী।

মূলত আড়াই বছর আগে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এসি, ফ্রিজ মেরামত বিষয়ে হাতে–কলমে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন আবদুর রাজ্জাক। এরপর কাজের খোঁজে আর না ঘুরে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেই ব্যবসা শুরু করেছেন।

আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১১ সালে আমার বাবা মারা যান। এরপর অভাবের কারণে পড়াশোনা বন্ধ করে দিই। সংসারের খরচ সামলাতে দীর্ঘদিন দিনমজুরির কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু পিকেএসএফের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে আমার আর্থিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। জীবনে কোনোদিন এক টাকা জমাতে পারিনি। এখন কেউ চাইলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ধারও দিতে পারব।’

দেশে বেকার বা নিম্ন আয়ের পরিবারের তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ২০২২ সাল থেকে রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পিকেএসএফ। সারা দেশের আবদুর রাজ্জাকের মতো লক্ষাধিক তরুণ এই প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

সম্প্রতি দিনাজপুরে রেইজ প্রকল্পটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সরেজমিন পরিদর্শনে যান এই প্রতিবেদক। এ সময় প্রকল্পটির আওতায় প্রশিক্ষণ ও ঋণ নেওয়া একাধিক উদ্যোক্তা, চাকরি পাওয়া ব্যক্তি ও প্রশিক্ষণদাতাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের নানা গল্প জানা যায়।

প্রকল্পের তিন দিক

পিকেএসএফের কর্মকর্তারা জানান, রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রধানত তিনটি কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ওস্তাদ-শাগরেদ মডেলে শিক্ষানবিশি কার্যক্রম। দেশে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় বেকার থাকেন। আবার উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে কম মজুরি ও ঝুঁকিপূর্ণ নানা অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হন অনেকে।

আবদুর রাজ্জাক এসি ও ফ্রিজ মেরামতের কাজ শিখে নিজেই এখন ব্যবসা করেন। সম্প্রতি দিনাজপুর সদর উপজেলায়
ছবি: প্রথম আলো

এ ধরনের ১ লাখ ৩ হাজার বেকার ও অদক্ষ তরুণকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে সারা দেশের প্রায় ৬৭ হাজার শিক্ষানবিশ তরুণ এমন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

প্রকল্পের দ্বিতীয় দিক হচ্ছে উদ্যোক্তা উন্নয়ন। এর আওতায় দেশের প্রায় সোয়া ২ লাখ তরুণ উদ্যোক্তাকে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁদের ব্যবসা সম্প্রসারণে দেওয়া হচ্ছে ঋণসহায়তা। এতে একদিকে ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিধি বাড়ছে, একই সঙ্গে সেখানে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে।

এমনই একজন উদ্যোক্তা যশোরের সুমন মজুমদার। তিনি দীর্ঘদিন অন্যের কারখানায় ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাজ করেছেন। আট–নয় বছর আগে নিজে কারখানা দেন। কিন্তু উন্নত যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের স্বল্পতায় ব্যবসায় ভালো করছিলেন না। পরে রেইজ প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ ও অর্থসহায়তা পেয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করছেন, যা আগে ১ লাখ টাকা ছিল।

এ ছাড়া করোনা মহামারির সময় দেশে অনেক ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় ধাক্কা খায়। এমন ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দেড় লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করা হচ্ছে রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে ৫৩ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়ন করছে। মাঠপর্যায়ে ৮৯টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে দেশের ৬৪টি জেলার ৩৮০টির বেশি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সব মিলিয়ে দেশের সোয়া চার লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা তাদের লক্ষ্য।

টেকসই কাজের ব্যবস্থা

সরেজমিন জানা গেছে, রেইজ প্রকল্পের ওস্তাদ-শাগরেদ মডেলে করা শিক্ষানবিশি কার্যক্রমে তরুণদের মোট ২৬টি বিষয়ে (ট্রেড) ছয় মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ট্রেডগুলোর মধ্যে রয়েছে—কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, বৈদ্যুতিক কাজ, হালকা প্রকৌশল, ওয়েল্ডিং, অটোমেকানিক, পোশাক তৈরি ও সেলাই, খাদ্য প্রস্তুত করা, গ্রাফিক ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রভৃতি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হাতে–কলমে কাজ শেখার কারণে প্রশিক্ষণ শেষে এই তরুণেরা টেকসই কাজের সুযোগ পান।

দিনাজপুর সদরের ভাটপাড়া গ্রামের সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর তরুণ ফান্সিস কিস্কুর শিক্ষাজীবনও অর্থাভাবে থেমে যায়। পরিবারের খরচ সামলাতে একপর্যায়ে রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু তাতে আয় হতো সামান্যই। পরে পিকেএসএফের মাধ্যমে স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন ও মেইনটেন্যান্স বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। বর্তমানে সেই প্রতিষ্ঠানেই ১৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন ফান্সিস।

প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে কাজ করছেন বয়েতা খাতুনসহ (বাঁ থেকে তৃতীয়) কয়েকজন। সম্প্রতি দিনাজপুর সদর উপজেলায়
ছবি: প্রথম আলো

ওই ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী ও পিকেএসএফের প্রশিক্ষণদাতা ওস্তাদ রবি গমেজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন প্রশিক্ষণার্থীকে ছয় মাসের মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলো শেখাতে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে দ্রুততম সময়ে তারা দক্ষতা অর্জন করে ভালো উপার্জন শুরু করতে পারে।’

নারী, প্রতিবন্ধী, পিছিয়ে পড়াদের অগ্রাধিকার

নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিদের প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে দিনাজপুরের প্রত্যন্ত এলাকা মারডুবি দশ মাইল গ্রামের বয়েতা খাতুনের কথা বলা যায়। ২০০৬ সালে এই নারীর বিয়ে হয়। তাঁর স্বামী একজন স্কুলশিক্ষক। ২০১২ সালে বয়েতা খাতুন এইচএসসি পাস করেন। সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধার্ধে একপর্যায়ে পরিবার নিয়ে দিনাজপুর শহরে আসেন তাঁরা। কিন্তু স্বামীর একার আয়ে চলা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। ২০২৫ সালে বয়েতা খাতুন রেইজ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এখন তিনি সেই প্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন।

বয়েতা খাতুন বলেন, ‘আমি আয় করায় সংসারে ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমেছে। সন্তানকে পছন্দের জিনিস কিনে দিতে পারছি, নিজের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারছি।’

২০২২ সালে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এ প্রকল্পের। এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল এ বছরের জুন মাসে। এর আগেই এ প্রকল্পে নতুন অর্থায়ন করে বিশ্বব্যাংক; সঙ্গে মেয়াদও ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেইজ প্রকল্প মূলত আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ। এখানে ঐতিহ্যবাহী “ওস্তাদ-শাগরেদ” মডেলকে আরও আধুনিক ও সুসংগঠিত করা হয়েছে। সফল উদ্যোক্তা ও ওস্তাদদের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষানবিশদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’

এই প্রকল্পের প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন, এমন তথ্য জানিয়ে মো. ফজলুল কাদের আরও বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এসব তরুণ শুরুতেই মাসিক ৯ থেকে ২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন, যা অনেক প্রথাগত কারিগরি শিক্ষা বা ভোকেশনাল শিক্ষিতদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় না। সব মিলিয়ে এটি একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও টেকসই কর্মসহায়ক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’