সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সংকটে পড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের কঠিন শর্তের ঋণগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখনই বড় বিপদের শঙ্কা নেই। তবে মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কঠিন শর্তের এসব ঋণ নেওয়ায় কয়েক বছর পরই ঋণ পরিশোধে বাড়তি চাপ আসবে, এটা অবধারিত। চীন, রাশিয়া ও ভারতের ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে প্রতিবছর গড়ে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হবে।

হঠাৎ করে যেন বাড়তি ঋণ পরিশোধের চাপ না আসে, সেই মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। বর্তমান বিদেশি মুদ্রার মজুত ব্যবস্থাপনাও ঠিক করতে হবে। বছরে গড়পড়তায় ঋণ পরিশোধের হিসাব থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি ঋণের বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। শ্রীলঙ্কার ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

২০২৬ সাল থেকে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ শুরু

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২৩ সালে শেষ হবে। এ প্রকল্পে খরচ হচ্ছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলার বা বর্তমান বাজারদরে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই রাশিয়ার সঙ্গে এ ঋণচুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত হলো ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২০ বছর। এর মধ্যে প্রথম ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড। এর মানে, ২০২৬ সাল থেকে পরের ১০ বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। লন্ডন ইন্টারব্যাংক লেনদেন হার বা লাইবরের সঙ্গে পৌনে ২ শতাংশ সেবামাশুল দিতে হবে। লাইবর সাধারণত আড়াই থেকে ৩ শতাংশ হয়। গত মার্চ মাস পর্যন্ত ৪৫২ কোটি ডলার ছাড় করেছে রাশিয়া। যুদ্ধের কারণে আপাতত এ ঋণের লেনদেন বন্ধ আছে।

চার বছর পর থেকেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। দুই কিস্তিতে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। ২০৩৬ সালে এ ঋণ শেষ হবে।

চীনের অর্থায়নে ১২ প্রকল্প

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে ১২টি প্রকল্পের জন্য চীনের সঙ্গে ১ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে সড়ক টানেল নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এ প্রকল্পে সব মিলিয়ে ১৯৫ কোটি ডলার দিয়েছে চীন। প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি অর্থবছর ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

বাকি প্রকল্পগুলোর অন্যতম হলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ, শাহজালাল সার কারখানা, দাশেরকান্দি পয়োবর্জ্য শোধনাগার, ইনফো সরকার-৩, মডার্নাইজেশন অব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কানেকশন, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও বিতরণ ও সম্প্রসারণ ইত্যাদি। ঋণের সিংহভাগ অর্থ ছাড় হয়ে গেছে। চীনের ঋণের একটি ছাড়া বাকি ১১টির সুদের হার সোয়া ২ শতাংশ এবং গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১৫ বছর।

ইতিমধ্যে শাহজালাল সার কারখানা, পদ্মার পানি শোধনাগার ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন—এ তিন প্রকল্পে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের মতো ঋণ পরিশোধ হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর চলতি বছর ও আগামী বছর থেকে শুরু হয়ে আগামী ১০ বছরে সব অর্থ পরিশোধ শুরু করতে হবে।

ভারতের ঋণ ৭৩৬ কোটি ডলার

তিনটি লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় গত এক যুগে ৭৩৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। ভারতের ঋণের পরিশোধের সময়সীমা গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর। সুদের হার ১ শতাংশ। তবে শর্ত হলো ভারতীয় ঋণের প্রকল্পে অন্তত ৬৫ শতাংশ কেনাকাটা ভারত থেকে করতে হবে। এ প্রকল্পের আওতায় ৩০টির বেশি প্রকল্প চলছে। এ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের বেশি ছাড় হয়েছে। ইতিমধ্যে ১০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ হয়েছে। আর কোনো ঋণ না নিলে ২০৩২ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছ থেকে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চুক্তি হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা ধরে) টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৩ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। মোটাদাগে এসব প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে আগামী তিন–চার বছর পর থেকে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে।

কোনো দেশের সঙ্গে ঋণচুক্তি করার সময় অর্থ পরিশোধের একটি মেয়াদ নির্ধারণ করা দেওয়া হয়। এ মেয়াদের মধ্যে একটি গ্রেস পিরিয়ড থাকে। ওই গ্রেস পিরিয়ডে ঋণের কিস্তির সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয় না।

কঠিন শর্তের ঋণ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার মতো আমরা ভুল করব না। অর্থনীতি পরিচালনায় আমরা তুলনামূলক কম ভুলভ্রান্তি করেছি। সম্প্রতি চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছ থেকে কঠিন শর্তে (ঋণ পরিশোধের সময় ২০ বছর) ঋণ নিলেও তা পরিশোধে তেমন সমস্যা হবে না। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত চাহিদা অনুযায়ী আছে। সার্বিকভাবে দেশের উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতির নিজস্ব শক্তিমত্তা ও স্থিতিশীলতা আছে।’

২০২৯ সালে সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ

এদিকে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক প্রতিবেদনে নতুন ঋণচুক্তি না হলে, শুধু পাইপলাইনে থাকা প্রতিশ্রুতি থেকে ঋণ পেলে এবং আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধে কী পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে এবং ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ কত, তা দেখানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সব মিলিয়ে ২৭৮ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে।

২০২৯-৩০ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ৫১৫ কোটি ডলার খরচ হবে। এরপর ঋণ পরিশোধ কমতে থাকবে। বিদ্যমান ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী তিন বছর বাংলাদেশের ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণও বাড়তে থাকবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৮ হাজার ৫২৪ কোটি ডলার। তবে ২০২৯-৩০ অর্থবছর নাগাদ তা কমে ৭ হাজার ২৯১ কোটি ডলার হবে। এ হিসাব করতে সাম্প্রতিক ডলারের দামের ওঠানামা আমলে নেয়নি ইআরডি।

এদিকে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের মতো পাইপলাইনে আছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৪ লাখ ৪০ কোটি টাকা টাকার মতো।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন