গ্রাহকের বয়স ১০০ বছর হলেও পেনশনের সুযোগ দিচ্ছে মেটলাইফের ‘লাইফলাইন’
অবসরের পর কীভাবে চলবে জীবন—মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীদের জন্য বরাবরই এটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। সরকারি পেনশন সুবিধার বাইরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাই দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশনধর্মী বিমাপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ১৯৫২ সাল থেকে এ অঞ্চলে কাজ করা মেটলাইফ বাংলাদেশের রয়েছে এ ধরনের বিমাপণ্য। ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদি এই বিমার নাম ‘লাইফলাইন।’
আজীবন এমনকি বয়স ১০০ বছর হলেও এই বিমা থেকে সুবিধা পাওয়া যায়। ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী যে কেউ ‘লাইফলাইন’ পণ্যের গ্রাহক হতে পারেন। পলিসি হতে পারে দেড় লাখ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত। মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে প্রিমিয়াম দেওয়ার সুযোগ আছে। মোট জমা টাকার বিপরীতে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যায়।
‘লাইফলাইন’ মূলত অবসরভিত্তিক জীবনবিমা পণ্য। মেটলাইফ এ পণ্যের জন্য দুটি স্লোগান ঠিক করেছে। একটি হচ্ছে, ‘কর্মক্ষম খাতকেই করুন অবসরজীবনের পরিকল্পনা’, অন্যটি ‘অবসরজীবনেও সুখে থাকুন এখন যেমনটি আছেন।’
লাইফলাইনে একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রিমিয়াম জমা দেন। পরে নির্ধারিত বয়স বা মেয়াদ শেষে মাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে পেনশন পান। মেটলাইফের তথ্য অনুযায়ী, এই পণ্যে সঞ্চয় ও বিমা সুরক্ষা একসঙ্গে থাকে। অর্থাৎ পলিসি চলাকালে গ্রাহকের মৃত্যু হলে নমিনি (মনোনীতক) নির্দিষ্ট বিমা সুবিধা পান। আবার মেয়াদ পূর্ণ হলে গ্রাহক নিজে নিয়মিত পেনশন তোলার সুযোগ পান।
পলিসির মেয়াদ, গ্রাহকের বয়স ও কাঙ্ক্ষিত পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী প্রিমিয়াম নির্ধারণ হয়। এর সঙ্গে হাসপাতাল কেয়ার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, দুর্ঘটনা বিমা বা প্রিমিয়াম ছাড়ের মতো অতিরিক্ত সুবিধাও যুক্ত করা যায়। এসব সুবিধা যুক্ত হলে প্রিমিয়ামও বেড়ে যায়। যদিও বোনাস নিশ্চিত হয় কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
দেশে সরকারি চাকরির বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের জন্য সরকার অবশ্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে। বেসরকারি আর্থিক খাতে পেনশনের সুবিধা দিচ্ছে বিমা কোম্পানিগুলোও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেসরকারি চাকরিজীবীদের বড় অংশের জন্য বাধ্যতামূলক পেনশন ব্যবস্থা নেই। ফলে মানুষকে নিজের আগ্রহেই এই ব্যবস্থা নিতে হয়।
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের মানুষের গড় আয়ু যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়। এসব কারণেই মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ ধরনের পেনশন পণ্যের প্রয়োজনীয়তা আছে। চাহিদাও বাড়ছে। কর রেয়াতের সুযোগ থাকায় অনেকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর পর ব্যাংকের মাধ্যমেও এসব পণ্যের বিক্রি বাড়ছে।
তবে লাইফলাইনসহ দীর্ঘমেয়াদি বিমা পণ্য নিয়ে গ্রাহকদের মূল প্রশ্ন হলো, এ থেকে কত মুনাফা নিয়ে। অনেকেই পেনশন বা সামগ্রিকভাবে বিমাকে ব্যাংকের ডিপিএস বা এফডিআরের সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু বিমার সঙ্গে ডিপিএস ও এফডিআরের মূল পার্থক্য হলো, উভয়ের উদ্দেশ্য এক নয়। বিমার উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া, ফলে বিমার মুনাফা ও ডিপিএস/এফডিআরের মুনাফা আলাদা।
কিছু গ্রাহকের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় প্রিমিয়াম দেওয়ার পর প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় না। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, বোনাস ও সম্ভাব্য মুনাফা সম্পর্কে শুরুতে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয় না। কেউ আবার দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি ও সেবার প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ বিলম্ব, কাগজপত্রের জটিলতা বা কম রিটার্ন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি দায়। এ ধরনের পলিসিতে অনেক বছর ধরে নিয়মিত প্রিমিয়াম দিয়ে যেতে হয়। বিমার নিয়ম অনুযায়ী মাঝপথে পলিসি বন্ধ করলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। ফলে আয় অনিশ্চিত—এমন ব্যক্তিদের পক্ষে দীর্ঘ সময় বিমা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। সেই সঙ্গে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, এই বিষয়টিও চিন্তার। তা সত্ত্বেও সব দিক বিবেচনা করে বলা যায়, অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা ঝুঁকি থেকে ব্যক্তির সুরক্ষায় বিমার প্রয়োজনীয়তা আছে। বিমাকে মুনাফার সাপেক্ষে বিবেচনা না করে ঝুঁকি সুরক্ষার সাপেক্ষে বিবেচনা করলে অনেক বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী করবেন
এ ধরনের পলিসি নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। প্রথমত, মোট কত বছর প্রিমিয়াম দিতে হবে এবং পুরো সময়ে তা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে কি না। দ্বিতীয়ত, নিশ্চিত মুনাফা কত।
এ ছাড়া পলিসি ভাঙলে কত টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, মৃত্যু–সুবিধা কত, সুবিধা বেশি চাইলে বাড়তি প্রিমিয়াম কত ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় বাস্তব রিটার্ন কত হতে পারে—এসব বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু এজেন্টের কথার ওপর নির্ভর না করে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিকল্প বিনিয়োগ—যেমন সঞ্চয়পত্র, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন স্কিম বা ব্যাংক আমানতের সঙ্গে তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ।