অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান এ নিয়ে প্রথম আলাকে বলেন, ‘ডলারের জোগান ও চাহিদা ব্যাংকগুলোর হাতে নেই। আর দামও আটকে রাখা যায় না। এই বাস্তবতা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এত দিনে বুঝছে। এ জন্য দাম নির্ধারণের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে।

ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যাহার করছে। কারণ, ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করেছিল। এতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় সংকট হতে পারত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে এই খাতের জন্য যত্নশীল ও জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেছে, এটা তার সংকেত। এটা দেশের জন্য ভালো।’

যা হয়েছিল

গত এপ্রিল থেকে ডলারে সংকট শুরু হয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে দাম বাড়ায় ও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে শুরু করে। এরপরও বাজার স্বাভাবিক না হওয়ায় গত জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ডলার কেনাবেচায় অতি মুনাফা করার তথ্য পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অতি মুনাফার জন্য গত ৮ আগস্ট দেশি-বিদেশি এই ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ট্রেজারি বিভাগ ব্যাংকের টাকা ও ডলারের জোগান এবং চাহিদার বিষয়টি নিশ্চিত করে থাকে। সরিয়ে দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান পদে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাও ছিলেন।

এরপর একই অভিযোগে ডলারের কেনাবেচায় অতিরিক্ত মুনাফা করে বাজার অস্থিতিশীল করার অভিযোগে গত ১৭ আগস্ট দেশি-বিদেশি এই ছয় ব্যাংকের এমডির কাছে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা অনুযায়ী ব্যাখ্যা তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইনের এই ধারা অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালক ও এমডিদের অপসারণ করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পুরো ব্যাংক খাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতিও থামেনি, আবার সংকটও কাটেনি। বরং এসব সিদ্ধান্তের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো দেশের ব্যাংকগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করে। ব্যাংকগুলোকে নতুন করে ঋণসুবিধা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আবার কোনো কোনো ব্যাংক যে ঋণসীমা (ক্রেডিট লাইন) দিয়ে রেখেছিল, তা-ও ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশের কিছু ব্যাংক আমদানি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে। আমদানিতে খরচও বেড়ে গেছে।

অভিযোগ থেকে অব্যাহতি

ছয় ব্যাংকের এমডির কাছে পাঠানো চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, যেকোনো ব্যাংক আইন ও নীতিমালা মেনে, নৈতিকতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ব্যাংকের কার্যক্রমের মাধ্যমে মুনাফা করতে পারে। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নেতিবাচক ব্যাংকিং কার্যকলাপের মাধ্যমে অতি মুনাফা অর্জন কোনোভাবেই কাম্য নয়।

যে অভিযোগ উঠেছে, তা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো এ–জাতীয় অতি মুনাফা অর্জন হয়েছে বলে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ জানতে পেরেছে। এ জন্য এসব ব্যাংকের এমডিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারার আওতায় যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল, তা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি এসব ব্যাংকের সরিয়ে দেওয়া ট্রেজারি প্রধানদের আগের পদে পুনর্বহাল করার সুযোগ দিয়েছে। তবে ব্যাংক নিজে বিবেচনা করবে, তাঁদের ওই পদে ফেরাবে কি না।

এ ছাড়া ব্যাংক ছয়টি গত মে-জুন মাসে ডলার কেনাবেচায় যে মুনাফা করেছিল, তার অর্ধেক আয় খাতে নিতে বলেছে। বাকি অর্ধেক অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতের (সিএসআর) বরাদ্দ রাখতে বলা হয়েছে। আগে এই মুনাফার পুরোটাই ব্যাংকের আয়ে না নিয়ে আলাদা হিসাবে রাখতে বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

পাশাপাশি ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসহ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং–সংক্রান্ত সব নিয়মনীতি মেনে চলাসহ রাষ্ট্রের স্বার্থে নৈতিকতার বিষয়টি মেনে চলতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক মুদ্রাবাজারকে অস্থিতিশীল করতে পারে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংকের এমডিরা এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। এ জন্য শর্তসাপেক্ষ বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ফলে এই ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদেরও কাজে ফিরতে কোনো সমস্যা নেই।’

অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া এমডিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ধন্যবাদ দিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধারাবাহিক পরামর্শ, ন্যায্য ও বাস্তব সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।

বিশেষ করে বর্তমান গভর্নরকে। বহুদিন ধরে ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির অখণ্ড অংশ, আর এখন সব খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশের অর্থনীতির উন্নতিতে ব্যাংক খাত অন্য খাতের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ তিনি ব্র্যাক ব্যাংকেরও এমডি।

নিয়ন্ত্রণমূলক থেকে বাজারভিত্তিক

চলতি বছরের শুরুতে ডলারের দর ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে গত মার্চ থেকে তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে দেশের আমদানি খরচ হঠাৎ করে অস্বাভাবিক বেড়ে যায়।

তবে সেই তুলনায় বাড়েনি রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। এ জন্য দেশে ডলারের সংকট শুরু হয়। এপ্রিল থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ডলারের দাম ৯৫ টাকায় উন্নীত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সংকট আরও বাড়তে থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ডলারের সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)।

এতে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময় হার হবে নির্ধারণ করা সর্বোচ্চ ১০৮ টাকা ও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ৯৯ টাকা। আর আমদানির ঋণপত্রে বিনিময় হার নির্ধারণ করা হবে প্রবাসী আয় ও রপ্তানির বিনিময় হারের গড় করে।

এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ গড় হারের সঙ্গে অতিরিক্ত ১ টাকা বেশি নিতে পারবে। গতকাল ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা দামে ডলার কিনেছে। ফলে আমদানিতে এর চেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছে।

টাকার বিনিময় হার অবশ্য এখনো পুরোপুরি ভাসমান নয়। বরং একে নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বলছেন ব্যাংকাররা।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন