ছোট উদ্যোগ, বড় শক্তি: টেকসই উন্নয়নে এসএমই
প্রতিবছর ২৭ জুন বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয় বিশ্ব এসএমই দিবস। ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই দিবস ঘোষণা করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদানকে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের টেকসই বিকাশের পথ সুগম করা। বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এসএমই খাত একটি শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে এসএমই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৮ লাখের বেশি সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা দেশের মোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। বর্তমানে এই খাতের পরিধি বিবেচনা করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বনিম্ন ২০ লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা দিয়ে থাকে।
অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ:
কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২৫-৩০ শতাংশ তৈরি হয় এই খাতের মাধ্যমে।
জিডিপিতে অবদান: জাতীয় আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে।
বৈষম্য হ্রাস: গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে।
এসএমই খাতের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর শ্রমঘন বৈশিষ্ট্য। তুলনামূলকভাবে কম পুঁজি বিনিয়োগ করে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হওয়ায় এটি বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এ ছাড়া স্থানীয় কাঁচামালের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক উৎপাদনের মাধ্যমে এই খাত দেশের বৈদেশিক নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে আনে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন গতিশীল থাকে, তেমনি শহরমুখী জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
বিশেষ করে বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে এসএমই খাত এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক ঋণসুবিধা ও বিশেষ পুনঃ অর্থায়ন স্কিম চালু করা হয়েছে, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করছে। বর্তমানে হালকা প্রকৌশল, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য এবং বুটিক ও সেবা খাতে আমাদের এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান অবদান রেখে চলেছে।
অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের এসএমই খাত এখনো নানা ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০-৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের মূল ধারার বাইরে রয়ে গেছেন। সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদের হার, পর্যাপ্ত জামানতের অভাব এবং জটিল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া আজও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার অভাব এবং বাজার সম্প্রসারণের দুর্বলতাও এই খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।
এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সিএমএসএমই খাতে বিশেষ পুনঃ অর্থায়ন স্কিম, কোভিড-পরবর্তী প্রণোদনা প্যাকেজ, স্বল্প সুদে ঋণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ খাতে বার্ষিক ঋণ বিতরণের পরিমাণ আড়াই লাখ থেকে ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা এই খাতের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি এসএমই ফাউন্ডেশন দেশব্যাপী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নানামুখী কৌশলগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
তবে বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে এসএমই খাতকে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনমুখী হতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অনলাইন বিপণনব্যবস্থার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের যে লক্ষ্য, তার সফল বাস্তবায়নে এসএমই খাতের ডিজিটাল রূপান্তর একটি অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।
বিশ্ব এসএমই দিবস আমাদের প্রতিবছর এই বার্তাই মনে করিয়ে দেয় যে একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি কেবল বৃহৎ শিল্পে নয়, বরং অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগের সম্মিলিত শক্তির মধ্যে নিহিত থাকে।
লেখক: একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ও এসএমই গবেষক