সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের সাক্ষাৎকার

ব্যবসায়ী সংগঠন রাজনীতির বাইরে থাকলে সরকারেরই লাভ

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে ২২ বছর বয়সে এপেক্সে চাকরি শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে ধাপে ধাপে এখন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পদে। দেশের ব্যবসা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রাজনীতি, শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুজয় মহাজন

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন
প্রথম আলো:

কেমন আছেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: এককথায় বললে, উদ্বিগ্ন।

প্রথম আলো:

উদ্বিগ্ন কেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কথা ভেবে। অনেক সম্ভাবনা দেখি, এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে; কিন্তু যেদিকে এগোচ্ছি আর যে গতিতে এগোচ্ছি, তাতে সম্ভাবনার জায়গাগুলোকে শুধু কল্পনা বা আশা মনে হয়। এ কারণে উদ্বিগ্ন। 

প্রথম আলো:

আপনি কোন বয়সে ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: ১৯৯০ সালে ২২ বছর বয়সে এপেক্স ফুটওয়্যারে চাকরি শুরু করি। শুরু করেছিলাম ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে। চাকরির শুরুতে আমার প্রথম কাজ ছিল রপ্তানিমুখী প্রথম কারখানাটির নির্মাণকাজ তদারকি করা।

প্রথম আলো:

তখন কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করেছিলেন? এখনো কি সেসব সমস্যার মুখোমুখি হন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: ১৯৯০ থেকে ২০২৬ সাল—৩৬ বছর। দেশের, সমাজের, কাজের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে আমরা যে ধরনের বাজার ও পণ্য নিয়ে চিন্তা করতাম, সেখানে এখন অনেক উচ্চ মানের ও বাজারের জন্য পণ্য বানানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। আবার সে সময়ে বিদ্যুতের যে সমস্যা দেখেছি, এখনো তা দেখছি। সে সময় ব্যাংকের উচ্চ সুদ ব্যবসার পথে বড় বাধা ছিল, এখনো সেই সমস্যা আছে। ৩৬ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, আবার পুরোনো কিছু সমস্যা আবার সামনে আসছে।

প্রথম আলো:

পুরোনো সমস্যাগুলো একই রকম রয়ে গেছে, নাকি নতুন করে ফিরে আসছে?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতির আকারের তুলনায় অবকাঠামো ছিল অপ্রতুল। এখন অবকাঠামোর অনেক উন্নতি হয়েছে; কিন্তু এখন ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছির অর্থনীতির জন্য একই ধরনের ঘাটতি দেখছি। এত দিনে তো ঘাটতি শব্দটাই থাকার কথা নয়। কিছুদিন আগে চীনের এক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁরা বাংলাদেশে নতুন একটি ব্যাগ কারখানায় বিনিয়োগ করেছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের দেশে কারখানা চালাতে জেনারেটর লাগে কেন? আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম। পরে তাদের উল্টো প্রশ্ন করলাম, তোমাদের শেষ কবে লোডশেডিং হয়েছে? ওই বিনিয়োগকারী বললেন, তিনি স্মরণ করতে পারছেন না, গত ২৫ বছরের মধ্যে শেষ কবে লোডশেডিং হয়েছে। এটা সত্যিই ভীষণ বেদনাদায়ক একটি বিষয়। দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমরা যখন কারখানায় গ্যাস–সংযোগ নিয়েছি, তখন অনেক আশা করে প্রায় চার কোটি টাকায় পৃথিবীর খুব নামকরা একটা ব্র্যান্ডের গ্যাসের জেনারেটর কিনেছিলাম। কিন্তু গ্যাস পাইনি বলে সেটা এক দিনও ব্যবহার করা হয়নি। নতুন অবস্থায় কারখানাতেই পড়ে ছিল। শেষে খুব কম দামে বিক্রি করে দিয়েছি। যেকোনো উৎপাদনমুখী কারখানার প্রধান উপকরণ লোকবল, বিদ্যুৎ, গ্যাস। আমাদের লোকবল আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ আর গ্যাসের ঘাটতি আমাকে ভাবাচ্ছে।

প্রথম আলো:

১৯৯০ থেকে ২০২৬—এ সময়ের মধ্যে ব্যবসায় সবচেয়ে উন্নতি হয়েছে কোন খাতে?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: মানুষের কর্মক্ষমতা। ৩৬ বছর ধরে দেখছি, আমাদের মানুষের যেকোনো কাজ করে দেওয়ার, যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর যে সক্ষমতা আছে, পৃথিবীর খুব কম দেশেই তা আছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা দিনরাত করে উৎপাদন করছি, শিপমেন্ট করছি, রপ্তানির তারিখ ঠিক রাখতে পারছি। এসব সম্ভব হচ্ছে মানুষের সক্ষমতার কারণে। 

দুই বছরে আমরা শৃঙ্খলার ও নিরাপত্তার অভাব বোধ করছি। কথায় কথায় রাস্তা বন্ধ, মব হচ্ছে। আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। এটা আমাদের জন্য এখন খুবই চিন্তার বিষয়। আগে এটা নিয়ে এতটা চিন্তিত ছিলাম না। মানুষ আমাদের সম্পদ। কিন্তু এই একই মানুষ এখন আমাদের জন্য একটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে
প্রথম আলো:

এ সময়ে একজন ব্যবসায়ী ও নাগরিক হিসেবে আপনাকে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে? 

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: নিরাপত্তার অভাব। গত দুই বছরে আমরা শৃঙ্খলার ও নিরাপত্তার অভাব বোধ করছি। কথায় কথায় রাস্তা বন্ধ, মব হচ্ছে। আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। এটা আমাদের জন্য এখন খুবই চিন্তার বিষয়। আগে এটা নিয়ে এতটা চিন্তিত ছিলাম না। মানুষ আমাদের সম্পদ। কিন্তু এই একই মানুষ এখন আমাদের জন্য একটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এখন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চাই। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পর সেটার কোনো আইনগত পরিণতি নেই। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার দলমত-নির্বিশেষে সবার জন্য আইনের শাসন দৃষ্টান্তমূলকভাবে প্রতিষ্ঠা করা।

প্রথম আলো:

এই যে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কথা বললেন, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: আমাদের প্রথমে ঠিক করতে হবে কোন জিনিসটা আমরা এখনই করতে চাই। আমরা অনেক কিছু করতে চাই। কিন্তু আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সবচেয়ে জরুরি কাজগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা আগে ঠিক করতে হবে। বেআইনি চলাচল, বেআইনি যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যখন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন, তখন দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থা তাকে বলে দেয় দেশটা কীভাবে চলছে। এ ছাড়া আমরা জানতে পেরেছি সরকার ডিরেগুলেশন কমিটি করেছে। আমি এটিকে সময়োপযোগী ও জরুরি উদ্যোগ হিসেবে দেখি। কিছু বিষয়ে আমাদের এখনই দৃশ্যমান ফলাফল দরকার। তাতে আস্থা ফিরবে। গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে সরকারকে জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা জানি গ্যাসের স্বল্পতা আছে। কিন্তু যেটুকু আছে, তা আমরা কোথায় কতটা কীভাবে ব্যবহার করব, সেই সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হবে। গ্যাস ছাড়া আমরা কলকারখানা চালাতে পারছি না।

প্রথম আলো:

আপনি স্বল্প মেয়াদে সরকারের কিছু করণীয় বিষয়ে বললেন। মধ্য মেয়াদে করণীয় কী হওয়া উচিত?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক করা। বাপেক্স বা ট্যারিফ কমিশন—এসব প্রতিষ্ঠানে সঠিক, সক্ষম এবং দীর্ঘমেয়াদি মানুষ তৈরি করতে হবে। সরকারি আইন অনুযায়ী দুই বছর পরপর এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু মানুষ বদলে দেবেন, এভাবে প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। বেসরকারি বিভিন্ন খাত থেকে যোগ্য ও দক্ষ লোক খুঁজে পাওয়া যাবে। তাঁদের এনে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ঠিক করতে পারি, তাহলে আমরা সুশাসনের দিকে যেতে পারব। ভুল মানুষ দিয়ে প্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজেশন বা মান উন্নত করার চেষ্টা করলে তার কোনো ফল পাওয়া যাবে না।

প্রথম আলো:

দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের করণীয় কী বলে মনে করেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের প্রথম উদ্যোগ হতে হবে একটা কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিক্ষার মান উন্নত করা। আমরা কিছুদিন পরপর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। তাতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে সমাজ, অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত আধুনিক ও সময়োপযোগী। আমরা এখন এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আছি, যেখানে ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি বেশি, সক্ষম মানুষ তৈরি করছি না। একদিকে আমাদের এত শিক্ষিত বেকার, অন্যদিকে বিদেশি লোক নিয়োগ করতে হচ্ছে। কেন আমরা বিদেশি লোক নিয়োগ করছি; কারণ, দেশে দক্ষ লোক খুঁজে পাচ্ছি না। তাহলে এই যে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে ফারাক, এটা কীভাবে দূর হবে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেখানে ৬ মাস, ৯ মাস, ১২ মাস—এ ধরনের কোর্সের মাধ্যমে বাজারের চাহিদাভিত্তিক কিছু দক্ষ লোক তৈরি হবে। তাহলেই আমরা স্থানীয় বাজার আর বিদেশের বাজারের জন্য দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারব।

প্রথম আলো:

আমরা এত বছরেও কেন একটা বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারলাম না?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। আমি বলব, শিক্ষার রাজনীতিকরণ মোটেই উচিত নয়। রাজনীতিবিদ আর আমলাতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়ে যদি সব সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে কোনো ভালো ফল আসবে না। শিক্ষার সঙ্গে দেশের সব মানুষ জড়িত। সে জন্য শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে হবে সবাইকে নিয়ে। যাঁরা শিক্ষা দেন, যাঁরা শিক্ষা নেন, সরকার ও সমাজে যাঁরা শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের সবাইকে এক জায়গায় আনতে হবে। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের কথাও ভাবতে হবে। আমরা উৎপাদনশীলতা নিয়ে অনেক হা–হুতাশ করি। কারখানা পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা কম হওয়ার একটা কারণ হচ্ছে স্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতার অভাব। আমরা দেখছি মানুষের পুষ্টির অভাব, বিশেষ করে নারী ও শিশুর মধ্যে—এটা এখন আমাদের জন্য বড় চিন্তার বিষয় হয়ে গেছে। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মানসম্মত ও সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

প্রথম আলো:

তার মানে আপনি বলতে চান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জাতীয় ইস্যুতে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: অবশ্যই। এটাই করতে হবে। কারণ, শেষ বিচারে আপনাকে-আমাকে স্থানীয় ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে এবং হবে। আমরা যদি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকতে পারব না। আমরা এখন খুব জনমিতির সুবিধার (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কথা বলি। কিন্তু জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে না পারলে এই সুবিধা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এখন জনমিতির যে সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, ২০-২৫ বছর পর সেটি শেষ হয়ে যাবে। তখন কী হবে? তাই জনসংখ্যা যেন আমাদের জন্য জনসম্পদের বদলে বোঝা হয়ে না যায়, সে জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সুশাসন—এই তিনটির ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। 

প্রথম আলো:

আবার একটু ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরে আসি। আপনি ৩৬ বছর আগে যখন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন, তখন যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, এখনো কি তা দেখেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: নব্বইয়ের দশকের চেয়ে এখন অনেক বেশি সম্ভাবনা দেখি। অনেক অপ্রাপ্তি ও দুঃখকষ্টের মধ্যেও আমরা অনেক এগিয়েছি। তবে যেখানে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের অনেক সমস্যা আছে, তা সত্ত্বেও আমাদের বিশাল সম্ভাবনা হচ্ছে আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম আলো:

দেশে তো বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান কমছে, সেবা খাত বড় হচ্ছে, কিন্তু সেখানে তো কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। তাহলে কীভাবে জনসংখ্যাকে কাজে লাগানো যাবে?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: উৎপাদনশীল খাত ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে আমরা খুব বেশি এগোতে পারব না। চীন সর্বোচ্চ দারিদ্র্য থেকে মানুষকে মুক্ত করে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে উৎপাদনশীল খাত ব্যবহার করে। আমাদেরও সেই পথে যেতে হবে। এই খাত শক্তিশালী করতে হলে বিদ্যুৎ-জ্বালানি, অর্থায়নের বিষয়গুলো সুনিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে সেবা খাতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। কারণ, উৎপাদনশীল খাতকে আমরা প্রতিযোগিতায় সক্ষম করতে পারিনি। সেবা খাতে বিনিয়োগ করে যত দ্রুত মুনাফা করা যায়, শিল্প বা উৎপাদন খাতে ততটা সম্ভব নয়। আবার উৎপাদন খাত ছাড়া কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে না। তাই উৎপাদনশীল খাতকে বড় করতে চাইলে, এ খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হলে ব্যবসার খরচ কমাতেই হবে।

প্রথম আলো:

নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না কেন? কেন দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: নতুন বিনিয়োগ তখনই আসবে, যখন পুরোনো বিনিয়োগকারীরা ভালো করবেন। সেটা দেশি-বিদেশি উভয় ক্ষেত্রেই সত্য। নতুন বিনিয়োগকারীরা এসে কার সঙ্গে কথা বলবেন? অবশ্যই সরকারের সঙ্গে। তাঁরা জানতে চাইবেন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী নীতি আছে, প্রণোদনা সুবিধা কী। তারপর তাঁরা নিজেরা বাজার যাচাই-বাছাই করবেন। শিল্পমালিকেরা কী বলেন, তাঁদের ব্যবসার অবস্থা কী—এসব জানতে চাইবেন। বিদ্যমান শিল্প ও উদ্যোক্তাদের গল্পগুলো যত ইতিবাচক হবে, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা তত সহজ হবে। তাই সরকারের উচিত বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ ও সমস্যামুক্ত করা।

প্রথম আলো:

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসার খরচ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি, উচ্চ সুদ, দুর্নীতির বাধার কথা আপনারা যুগের পর যুগ বলে আসছেন, তবু এগুলো দূর হয় না কেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। আমলাতন্ত্র ও রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এখানে একটা বিভাজন খুব দরকার ছিল। আমরা আমলাতন্ত্রেরও রাজনীতিকরণ করেছি। কাকে কোন পদে দেওয়া হবে, কাকে কত দিন রাখা হবে—এসব করা হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। আরেকটি বিষয়, আমলাতন্ত্রের মধ্যে কোনো বেআইনি বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ খুব কম। এখানে পরিবর্তন দরকার। জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

প্রথম আলো:

গত কয়েক দশকে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের রাজনীতিবিদ হয়ে যাওয়ার বা দলীয় সুবিধা নেওয়ার যে সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যবসায়ীরাও রাজনীতির বাইরে থাকতে পারেননি। ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্য পাওয়া যাবে কি না—এই যদি হয় কোনো ব্যবসার ভিত্তি, তাহলে সেই ব্যবসা টেকসই হবে না। বাংলাদেশের ব্যবসায় যাদের আমরা রোল মডেল ধরতে পারি—যেমন ধরুন ইস্পাহানি গ্রুপ—তারা তো বহুদিন ধরেই এ দেশে ব্যবসা করছে। তাদের তো ভালো ব্যবসা করার জন্য রাজনীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তাদের ওপর কি রাজনীতির চাপ আসে না? নিশ্চয়ই আসে। তারা হয়তো সেটা তাদের মতো করে মোকাবিলা করে। হ্যাঁ, এখানে ব্যবসা করতে গেলে রাজনৈতিক চাপ আসতে পারে। সে জন্য ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের রাজনীতিতে যুক্ত হতে হবে, এটা আমি ভুল বলে মনে করি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে যুক্ত হলে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যান। আমাদের এখানে একই সঙ্গে ব্যবসাও করব, রাজনীতিও করব—এই মানসিকতাই বড় সমস্যা।

প্রথম আলো:

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হলে করণীয় কী?

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: আমার মনে হয়, এখানেও একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় আছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে রাজনীতির বাইরে রাখা হলে সরকারেরই বেশি লাভ। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইকে রাজনীতিমুক্ত একটা সংগঠন হিসেবে তৈরি করতে হবে। সেখানে ব্যবসায়ীরা তাঁদের সমস্যার কথা বলবেন, নিজেদের ও দেশের স্বার্থে সমস্যাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরবেন। এফবিসিসিআই সরকারের একটা শাখার মতো কাজ করবে—এই অবস্থা থেকে আমরা ব্যবসায়ীরা অবশ্যই পরিত্রাণ চাই। যতটুকু জেনেছি এ লক্ষ্যে এখন কাজ হচ্ছে। আশা করি সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে।