উত্তাল সাগর: পাইপলাইনে তেল খালাস স্থগিত
সব প্রস্তুতি নিয়েও সাগরে বড় ট্যাংকার থেকে পাইপের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি তেল খালাস করা যায়নি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তেল খালাসের কার্যক্রম স্থগিত করেন কর্মকর্তারা। সাগর শান্ত হওয়ার পর আবারও কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
বঙ্গোপসাগরে বড় জাহাজ থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল খালাসের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারি তেল শোধনাগার প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি। এই প্রকল্পের আওতায় সাগরে মুরিং বা জেটির মতো স্থাপনা বসানো হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল আজ রোববার। এ জন্য সৌদি আরব থেকে ৮২ হাজার টন তেল নিয়ে আসা ‘এমটি হোরাই’ ট্যাংকার থেকে প্রথমবার পাইপলাইনে তেল খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জানতে চাইলে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান প্রথম আলোকে বলেন, সাগর খুব উত্তাল। এ রকম উত্তাল সাগরে ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। সে জন্য পাইপের মাধ্যমে তেল খালাসের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আবহাওয়া ঠিক হলে কাল–পরশু আবারও এ কার্যক্রম শুরু হবে।
পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য ভাসমান জেটিতে ট্যাংকার ভিড়ানো, টাগবোটসহ যাবতীয় সহায়তা দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। রোববার সকাল থেকে বন্দর কর্মকর্তারা বন্দর থেকে জাহাজ নিয়ে সাগরে রওনা হন। এই কার্যক্রম দেখতে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল টাগবোটে চড়ে সাগরে রওনা হন। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে মাঝপথ থেকে ফিরে আসেন তিনি। এ সময় সেখানে ছিলেন সাংবাদিকেরাও।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল সাংবাদিকদের জানান, প্রথমবারের মতো পাইপলাইনে তেল খালাসের এমন উদ্যোগে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে বন্দর। সব প্রস্তুতি নেওয়ার পরও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হলে বন্দর থেকে সহায়তা দেওয়া হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের সীমাবদ্ধতার জন্য কর্ণফুলী নদীতে তেল খালাসের বিশেষায়িত জেটিতে বড় ট্যাংকার ভিড়তে পারে না। তাতে জ্বালানি তেল নিয়ে আসা বড় ট্যাংকারগুলো প্রথমে সাগরে নোঙর করে রাখা হতো।
এরপর ছোট ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল স্থানান্তর করে জেটিতে এনে পাইপের মাধ্যমে তেল খালাস করা হতো এতদিন। এতে এক লাখ টন তেলবাহী একটি ট্যাংকার থেকে তেল খালাসে ১০–১১ দিন সময় লাগত।
সনাতন পদ্ধতিতে তেল খালাসে খরচ ও সময় বেশি লাগায় ২০১৫ সালে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ বা ভাসমান জেটি নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তিন দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পর প্রকল্প ব্যয় ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নতুন প্রকল্পের আওতায় পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রায় এক লাখ টন জ্বালানি তেল খালাস সম্ভব হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারা জানান, এই প্রকল্পের আওতায় ১১০ কিলোমিটার লম্বা দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন বসানো হয়েছে। পাইপলাইনের সিংহভাগই সাগরের তলদেশে স্থাপন করা হয়েছে। একাংশ রয়েছে স্থলভাগে। একটি পাইপলাইন দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং আরেকটি পাইপলাইন দিয়ে পরিশোধিত ডিজেল খালাস হবে।
যেভাবে তেল খালাস
ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারা জানান, মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান জেটি বা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং স্থাপন করা হয়েছে। এই ভাসমান জেটি থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি আলাদা পাইপলাইনের মাধ্যমে জাহাজ থেকে প্রথমে তেল নিয়ে আসা হবে কালারমারছড়ায় পাম্প স্টেশন ও ট্যাংক ফার্মে। সেখানে দুই লাখ টন ধারণক্ষমতার ছয়টি ট্যাংক রয়েছে। সেখান থেকে ৭৪ কিলোমিটার লম্বা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আনা হবে আনোয়ারার সমুদ্র উপকূলে। সেখান থেকে ৩৬ কিলোমিটার পাইপলাইন পাড়ি দিয়ে তেল নেওয়া হবে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে বছরে ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে হবে। আবার বর্তমানে ডিজেল আমদানি হয় ৪২ লাখ টন। প্রতিবছর আমদানি বাড়ছে। প্রকল্পের আওতায় যে পাইপলাইন বসানো হয়েছে, তার মাধ্যমে বছরে ৯০ লাখ টন জ্বালানি তেল খালাস সম্ভব হবে।