২০২৬ সালে কোরবানির অর্থনীতিতে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কৃষি-শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে আপনাদের অর্জন কতটুকু এবং বাজারের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতিকে কীভাবে দেখছেন?
মো. আমিনুল ইসলাম: ২০২৬ সালের কোরবানির বাজারে উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান পশু উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান আরও শক্ত করেছে। নাবিল গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, ফিড, খামার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে, যা উত্তরাঞ্চলের হাজারো খামারিকে সংগঠিত বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এবারের কোরবানির অর্থনীতি হবে আরও পরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দেশীয় উৎপাদনভিত্তিক। বাজারে দেশীয় পশুর সরবরাহ সন্তোষজনক এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্থিতিশীল বাজার তৈরি হবে। নাবিল গ্রুপ শুধু ব্যবসায়িক অংশীদার নয়, বরং কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে। এবার আমরা প্রায় ২৫০টি সুস্থ গবাদিপশু বাজারে সরবরাহ করেছি। তবে খামারিরা সরাসরি ঢাকা বা চট্টগ্রামে পশু নিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে অগ্রিম ক্রেতা পাচ্ছেন না। এ কারণে শেষ মুহূর্তে ঢাকা-চট্টগ্রামে দাম কিছুটা বাড়তে পারে। এ ছাড়া ক্রেতার আর্থিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিক্রি কিছুটা কম হতে পারে।
উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পশু পরিবহনে আপনারা কী ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছেন এবং ক্যাটেল স্পেশাল ট্রেন এই সংকটে কতটা সহায়ক হতে পারে?
মো. আমিনুল ইসলাম: উত্তরাঞ্চল থেকে বড় ভোক্তা বাজারগুলোতে পশু পরিবহনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো দীর্ঘ যাত্রা, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, তীব্র যানজট এবং পথে পশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে কোরবানির সময়ে সড়কপথে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা সময় ও খরচ দুই দিক থেকেই খামারিদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে রেলওয়ের ‘ক্যাটেল স্পেশাল ট্রেন’ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। এটি চালু হলে দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে পশু পরিবহন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পশুর শারীরিক ধকল কমবে এবং মৃত্যুহার ও ওজন ক্ষতির ঝুঁকি হ্রাস পাবে। সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে কাজ করলে এই ব্যবস্থা খামারিদের জন্য লাভজনক হবে। তবে গবাদিপশু লোডিং এবং আনলোডিংয়ের জন্য রেলস্টেশনগুলোতে যথাযথ লজিস্টিকস অবকাঠামো থাকা একান্ত প্রয়োজন। তা ছাড়া শক্তিশালী সংযুক্ত পরিবহনব্যবস্থা থাকতে হবে এবং ট্রেনে পশুর দেখাশোনার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োজিত করতে হবে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে গোখাদ্যের দাম চড়া। পশুর উৎপাদন খরচ কমাতে এবং সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ কোরবানি নিশ্চিত করতে নাবিল গ্রুপ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে?
মো. আমিনুল ইসলাম: বৈশ্বিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব গোখাদ্যশিল্পেও পড়েছে। এই বাস্তবতায় নাবিল গ্রুপ উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ সাপ্লাই চেইন, আধুনিক ফিড ফর্মুলেশন এবং স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
আমরা খামারিদের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী ফিড নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশু পালন বিষয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ভেটেরিনারি সহায়তা এবং সঠিক ফ্যাটেনিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছি। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও যুক্তিসংগত মূল্যে কোরবানির পশু পাচ্ছেন। আমাদের মূল লক্ষ্য শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়; বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও টেকসই প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী করা।
সরকার অনলাইনে পশু বিক্রিতে কর মওকুফ করেছে। আপনাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল অ্যাগ্রো-বিজনেস মডেলটি এবার ক্রেতাদের জন্য নতুন কী সুবিধা নিয়ে আসছে?
মো. আমিনুল ইসলাম: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন ঐতিহ্যবাহী কোরবানির বাজারকে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করে তুলছে। সরকারের কর মওকুফের এই উদ্যোগ ডিজিটাল অ্যাগ্রো-সেক্টরে গতিশীলতা আনবে।
নাবিল গ্রুপের ডিজিটাল অ্যাগ্রো-বিজনেস মডেলে এবার ক্রেতারা ঘরে বসেই পশুর লাইভ ভিডিও, প্রকৃত ওজন, স্বাস্থ্যগত তথ্য এবং খামারের বিস্তারিত বিবরণ দেখতে পারবেন। এ ছাড়া ক্রেতাদের সুবিধার্থে অনলাইন বুকিং, নিরাপদ ডিজিটাল পেমেন্ট, নির্ধারিত সময়ে হোম ডেলিভারি এবং বিক্রয়-পরবর্তী কাস্টমার সাপোর্টের সুবিধাও থাকবে। আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি ক্রেতার আস্থা বাড়াতে এবং খামারিদের জন্য একটি ন্যায্য ও বিস্তৃত বাজার তৈরি করতে।
পশুর হাটে ক্যাশলেস লেনদেন জনপ্রিয় হচ্ছে। আপনাদের ডিলার ও খামারিদের এই ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অভ্যস্ত করতে আপনারা মাঠপর্যায়ে কী ধরনের কাজ করছেন?
মো. আমিনুল ইসলাম: বাংলাদেশ দ্রুত ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কোরবানির পশুর হাটও এর বাইরে নয়। নাবিল গ্রুপ মাঠপর্যায়ে আমাদের ডিলার, খামারি ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা মোবাইল ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্ট এবং ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।
রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া থেকে। পশুর যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণে আপনারা খামারিদের কী পরামর্শ দিচ্ছেন যাতে চামড়ার গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে?
মো. আমিনুল ইসলাম: চামড়ার গুণগত মান রক্ষা করতে পশুর সঠিক পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাবিল গ্রুপ খামারিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পশু পালন, সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত এফএমডি, অ্যানথ্রাক্স ও এইচএস রোগের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক টিকা প্রদানের পরামর্শ দিচ্ছে, যা সুস্থ গবাদিপশু এবং নিখুঁত চামড়া উৎপাদন নিশ্চিত করে। বিশেষভাবে জোর দিচ্ছি যাতে পশুর শরীরে কোনো ধরনের ক্ষত বা দাগ না হয়। কোরবানির পর চামড়া সংগ্রহ, দ্রুত ট্রিমিং, সঠিক নিয়মে লবণ প্রয়োগ এবং দ্রুত আড়ত বা ট্যানারিতে পরিবহনের বিষয়েও খামারি ও জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে। যাতে উন্নতমানের চামড়া দেশের রপ্তানি আয় বাড়ায়।
২০২৬ সালের এই সাফল্যকে পুঁজি করে ভবিষ্যতে কি বাংলাদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত মাংস রপ্তানির কোনো পরিকল্পনা নাবিল গ্রুপের রয়েছে?
মো. আমিনুল ইসলাম: বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত এখন আর শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হওয়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নাবিল গ্রুপ দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রসেসিং, কোল্ড চেইন এবং ফুড সেফটি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে প্রক্রিয়াজাত মাংস রপ্তানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
আমরা বিশ্বাস করি, সরকার–বেসরকারি খাত এবং খামারিদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ হালাল ও নিরাপদ মাংসের একটি সম্ভাবনাময় বৈশ্বিক সরবরাহকারী দেশে পরিণত হতে পারে। নাবিল গ্রুপ সেই গৌরবময় যাত্রায় একটি অন্যতম দায়িত্বশীল অংশীদার হতে চায়।