ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কোন ব্যাংকের বিশেষায়িত কোন কার্ড
ফ্রিল্যান্সার কে বা কারা? সহজ কথায়, ফ্রিল্যান্সার এমন একজন মুক্ত পেশাজীবী, যিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধীন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ না থেকে নিজের দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রাহকের জন্য কাজ করেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অবশ্য এই সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত। একজন ফ্রিল্যান্সার বাংলাদেশে বসে কাজ করলেও তাঁর লেনদেন–প্রক্রিয়া চলতে পারে নিউইয়র্ক বা লন্ডনের সঙ্গেও।
এই বৈশ্বিক পেশাজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং মাধ্যম। বাংলাদেশে গত এক দশকে ফ্রিল্যান্সিং খাতের যে বিপ্লব ঘটেছে, তার পেছনে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
ব্যাংক কার্ডের বিবর্তন: বিড়ম্বনা থেকে বিশেষ সুবিধা
ফ্রিল্যান্সিং খাতের শুরুর দিকে আয়ের টাকা দেশে আনা বা অনলাইন টুলস কেনার জন্য পেমেন্ট করা ছিল দুঃসাধ্য কাজ। গত এক দশকে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং খাতের অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে। বর্তমানে কয়েক লাখ তরুণ-তরুণী এই পেশার মাধ্যমে প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে আনছেন। তবে এই যাত্রার শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। এক সময় উপার্জিত ডলার বৈধ পথে দেশে আনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি বিদেশি সফটওয়্যার কেনা, ক্লাউড হোস্টিং বা আন্তর্জাতিক সাবস্ক্রিপশনের পেমেন্ট করতে গিয়ে ফ্রিল্যান্সারদের পড়তে হতো নানাবিধ বিড়ম্বনায়।
তবে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাত ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সাজিয়েছে নানা রকম বিশেষায়িত সেবা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো প্রথাগত কার্ডের বাইরেও নিয়ে এসেছে ‘ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ ও ‘এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটা’ বা ইআরকিউ সুবিধা। ডুয়াল কারেন্সি ফিচারের মাধ্যমে এই কার্ডগুলো এখন টাকার পাশাপাশি ডলার এনডোর্সমেন্টের ঝামেলামুক্ত সমাধান দিচ্ছে। ডোমেইন-হোস্টিং কেনা থেকে শুরু করে ফেসবুক-গুগল মার্কেটিংয়ের পেমেন্ট—সবই এখন হাতের মুঠোয়। এই কার্ডগুলো ফ্রিল্যান্সারদের কেবল আর্থিক সচ্ছলতাই নিশ্চিত করছে না, বরং তাঁদের পেশাকে দিয়েছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক ভিত্তি।
পকেটেই যখন ‘গ্লোবাল অ্যাক্সেস’
প্রশ্ন আসতে পারে, কোন কার্ডটি আপনার জন্য সেরা? দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো এখন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ‘সুবিধার লাল গালিচা’ বিছিয়ে রেখেছে। যেমন ইস্টার্ন ব্যাংকের স্কাইব্যাংকিং বা ফ্রিল্যান্সার কার্ড। কোনো বাৎসরিক ফি ছাড়াই এই কার্ডের মাধ্যমে ডুয়াল কারেন্সি সুবিধা আর আন্তর্জাতিক পেমেন্টের ঝামেলাহীন সমাধান দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সিটি ব্যাংকের আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডগুলো ফ্রিল্যান্সারদের জন্য লাক্সারি আর প্রফেশনালিজমের মিশেল। শুধু পেমেন্ট নয়, দেশের বাইরের এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ এক্সেস বা বিভিন্ন অনলাইন শপে ডিসকাউন্ট—সবই মিলছে এক কার্ডে। ব্র্যাক ব্যাংক বা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকও পিছিয়ে নেই। তাদের এনডোর্সমেন্ট প্রসেস এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ এবং ব্যবহারকারীবান্ধব। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক আয়ে সরকার ঘোষিত ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা সরাসরি অ্যাকাউন্টে আসার সুবিধা থাকায় এই কার্ডগুলো পেয়েছে অনন্য মাত্রা।
পরিচয়–সংকট কাটিয়ে হাতের মুঠোয় সরকারি স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন ফ্রিল্যান্সারদের একটা বড় আক্ষেপ ছিল—ব্যাংকে গেলে বা কোথাও পরিচয় প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ কাগজপত্র প্রদর্শনের সুযোগ ছিল না। বর্তমানে সরকারের আইসিটি বিভাগ থেকে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষায়িত আইডি কার্ড পাওয়া যাচ্ছে বিনা মূল্যে। এর মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সাররা সহজেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, লোন এবং আয়ের বৈধ সনদ পান। এমনকি যাঁরা নতুনভাবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছেন, তাঁদের কথা ভেবে আয়ের শর্তও কমিয়ে আনা হয়েছে বাৎসরিক মাত্র ৫০ ডলারে। অর্থাৎ সঠিক মাধ্যম ব্যবহার করে এক বছরে কমপক্ষে ৫০ ডলার দেশে আনলেই আপনি একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি পাবেন।