দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ছে দুই বছর ধরে। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে সয়াবিন তেলের দাম লিটার ১০০ টাকার আশপাশে ছিল। এ বছর যা ২০৫ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। পরে অবশ্য কমেছিল। এখন আবার বাড়ল। গত জানুয়ারি মাসেও চিনির কেজি ছিল ৭৫ টাকা, যা বাড়তে বাড়তে এখন শতক ছাড়িয়েছে।

পাঁচ সদস্যের একটি গড়পড়তা পরিবারে মাসে পাঁচ লিটারের মতো তেল এবং তিন কেজির মতো চিনি লাগে। নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির ফলে একটি পরিবারে তেল ও চিনি কিনতে ১০০ টাকার মতো খরচ বাড়বে।

ঢাকার শান্তিনগরের একটি ওষুধের দোকানের কর্মী মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দফায় দফায় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যয় কমিয়েও টিকে থাকা যাচ্ছে না। অবস্থা এমন যে কাটছাঁট করার আর জায়গা নেই, যা চাপানোর তা আগেই চাপানো শেষ।’

মূল্যবৃদ্ধি কী যুক্তিতে

সর্বশেষ গত ৩ অক্টোবর দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম কমানো হয় লিটারে ১৪ টাকা। সপ্তাহ দুয়েক পরেই দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেটি মূল্যায়নের পর দাম বাড়ানো হলো।

কী যুক্তিতে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বাড়ানো হলো, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেল ও চিনির দাম আবার বাড়ছে। ওদিকে দাম নির্ধারণে আগের দফায় আমদানির সময় শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ডলারের দাম ধরা হয়েছিল চালানভেদে ৯১ থেকে ৯৫ টাকা। এ দফায় ধরা হয়েছে ১০৫ টাকা। এ দুই কারণেই দাম বেড়েছে।

দেশে ভোজ্যতেল ও চিনির চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করে মেটানো হয়। কোম্পানিগুলো অপরিশোধিত ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানি করে পরিশোধন করে বিক্রি করে। দাম বাড়ানোর আগে তাদের ট্যারিফ কমিশনকে জানাতে হয়। কমিশন ব্যয় বিবরণী ধরে মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক কি না, তা যাচাই করে।

ট্যারিফ কমিশনের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে তৈরি একটি প্রতিবেদন বলছে, তখন প্রতি কেজি চিনিতে সরকার কর হিসেবে পেত ২৯ টাকা। এখন শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ডলারের দাম বাড়িয়ে ধরায় সরকারের আয় আরও বাড়বে। বিপরীতে দাম বেড়ে যাচ্ছে চিনির।

কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে শুধু ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা রয়েছে। সরকার গত মার্চে তেল ও চিনির ওপর শুল্ক কমায়। যদিও চিনি আমদানিতে এখনো উচ্চ হারে শুল্ককর রয়েছে।

শুধু তেল-চিনি নয়, সবকিছুর দামেই ডলারের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশে গত মে মাসে যে ডলার ৮৬ টাকা ছিল, তা এখন ১০৬ টাকা। মানে হলো ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ, যা যেকোনো পণ্য আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম ধরে রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ কয়েক মাসের মধ্যে তা লাগামছাড়া হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার থেকে নেমেছে ৩৪ বিলিয়ন (৩ হাজার ৪২৩ কোটি) ডলারে। বিভিন্ন তহবিল ও বিনিয়োগ বাদ দিলে প্রকৃত রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৬ বিলিয়ন ডলার (২ হাজার ৬০০ কোটি)।

এদিকে ওএমএসের আটার দাম সরকার বাড়িয়েছে ভর্তুকি কমাতে। খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, উচ্চ দামে গম কিনে ভর্তুকি দিয়ে তারা ১৮ টাকা কেজিতে খোলা আটা বিক্রি করত। নতুন দর হবে ২৪ টাকা। আর প্যাকেটজাত আটার দুই কেজির প্যাকেট খাদ্য অধিদপ্তর বিক্রি করবে ৫৫ টাকায়, যা এত দিন ৪৩ টাকা ছিল। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়বে। সাম্প্রতিক কালে ওএমএসের চাল ও আটা কিনতে মানুষ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বিক্রি হওয়া ১০ টাকার চালের দাম কেজিপ্রতি ১৫ টাকা করা হয়।

মূল্যস্ফীতি ‘আরও বাড়বে’

নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে গত আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ছিল ১১ বছর ৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্টোবরে তা কমে ৯ শতাংশের নিচে নামে (৮ দশমিক ৯১ শতাংশ)। তখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কর্মকর্তারা জানান, অক্টোবর মাসে চালের দাম কমেনি, আবার বৃদ্ধিও পায়নি। তবে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে। চাল-তেলের মূল্যবৃদ্ধি না পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম হয়েছে। ওদিকে গত অক্টোবরে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল চিনি।

নভেম্বরে এসে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম আরও বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, তেল ও চিনির দাম বাড়ার বিপরীতে মূল্যস্ফীতির ওপরে বড় প্রভাব ফেলে, এমন কোনো পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, ২ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর সময়ে ঢাকার বাজারে মোটা চালের সর্বনিম্ন দাম দুই টাকা ও সরু চালের দাম তিন টাকা কমেছে। বিপরীতে মাঝারি চালের দাম দুই টাকা বেড়েছে।

টিসিবির হিসাবে, বাজারে মোটা চাল কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও বেশির ভাগ বাজারে এ দরে চাল পাওয়া যায় না। মোটা চাল সাধারণত ৫০ টাকা কেজির আশপাশে বিক্রি হয়।

১৫ দিনে আটার সর্বনিম্ন দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা এবং মসুর ডাল ধরনভেদে ২ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। চাল, আটা ও ডালের দাম মূল্যস্ফীতির হিসাবের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে।

ডিমের হালিপ্রতি দর সাধারণত ৩০ টাকার আশপাশে থাকে। এটা উঠেছিল ৫৫ টাকায়। টিসিবি বলছে, এখন ডিম বিক্রি হচ্ছে হালিপ্রতি ৪৩ থেকে ৪৮ টাকায়। যে ব্রয়লার মুরগি ১৪০ টাকার আশপাশের দামে কেনা যেত, তা এখন কিনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা দরে।

সবজির দামেও স্বস্তি নেই। ঢাকার মালিবাগ ও রামপুরা কাঁচাবাজার ঘুরে গতকাল দেখা যায়, শীতের আগাম সবজি কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মুলার কেজিও ৪০ টাকার বেশি। মালিবাগ বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে শীতের সবজি আসতে শুরু করেছে। সবজির সরবরাহ ভালো, তবে দাম একটু বেশি।’

মজুরি বাড়ছে কতটুকু

নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও অসুবিধা হয় না, যদি সে অনুযায়ী মজুরি বাড়ে। অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, মজুরি বাড়ার হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। সর্বশেষ গত অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি যতটা বেড়েছে (৮ দশমিক ৯১ শতাংশ), তার চেয়ে কম হারে বেড়েছে মজুরি (৬ দশমিক ৯১ শতাংশ)।

শান্তিনগরের ওষুধের দোকানের কর্মী মাসুদুর রহমান বলছিলেন, তিনি যে সঞ্চয় করতেন, তা এখন করতে পারেন না। তাঁকে সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে।