পণ্য আমদানির চিত্র
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান দ্বার চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য এখন আগের মতো অপেক্ষা করতে হয় না নাবিকদের। দিনে দিনে ভেড়ানো যায় কনটেইনারবাহী জাহাজ। বন্দরের এমন চিত্র দেখে বোঝা যায়, বৈদেশিক বাণিজ্যের বর্তমান প্রবণতা কেমন। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমদানি তথ্যেও দেখা যায়, অর্থবছরের পঞ্চম মাস গত নভেম্বরে পণ্য আমদানিতে ভাটা শুরু হয়েছে। তবে অর্থবছরের শুরুতে পণ্য আমদানি বাড়তি ছিল। তাতে অর্থবছরের পাঁচ মাসের হিসাবে আমদানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ডলার–সংকট গত কয়েক মাসে প্রকট হয়। আমদানি নিয়ন্ত্রণে নানামুখী পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুরুতে বিলাসপণ্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের করভার বাড়ানো হয়। সংকট বেড়ে যাওয়ায় আমদানি নিয়ন্ত্রণে ৩০ লাখ ডলারের বেশি ঋণপত্র খোলার বিষয়ে তদারকি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নানামুখী পদক্ষেপে ঋণপত্র খোলার হার কমে আসছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এখন। 

পণ্যের আমদানিতে প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধির অর্থ হলো শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিণামে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা। উৎপাদনের ওপর ভর করে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ে।

তবে সংকটের সময় অপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন পণ্যের আমদানি কমে যাওয়া ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে এখন। কারণ, ডলার–সংকট মেটাতে সরকারি পর্যায়ে আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩৮৬ কোটি ডলার। 

স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আমদানি দায় মেটানোর সক্ষমতা এখন কম। ফলে শুধু জরুরি খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, সার ও রপ্তানি আয় আসবে—এমন কাঁচামালের আমদানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি

ভোগ্যপণ্য ও শিল্পপণ্যের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার সিমেন্ট ও সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ডলার–সংকটের মতো পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমে যাওয়া ইতিবাচক। তবে দেখতে হবে, রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পের কাঁচামালের আমদানি বেশি কমেছে কি না। কারণ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেশি কমে গেলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, উৎপাদন কমবে, দেশের প্রবৃদ্ধিও কমে যাবে। 

নভেম্বরে ভাটার টান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, গত নভেম্বর মাসে পণ্য আমদানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টন। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭১০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে ৭৬৪ কোটি ডলারের ১ কোটি ২৭ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়। অর্থাৎ পরিমাণগত দিক থেকে নভেম্বর মাসে আমদানি কমেছে ৮ শতাংশ; আমদানি ব্যয়ের হিসাবে কমেছে ৭ শতাংশ। 

নভেম্বরে কমলেও আগের চার মাসে আমদানি বেশি থাকায় সার্বিকভাবে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে পণ্য আমদানি কমেনি। তবে আমদানিতে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫ কোটি ৬৫ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয় ৫ কোটি ৩১ লাখ টন। পণ্য আমদানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। 

চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ডলার। এ হিসাবে আমদানি ব্যয় এখনো প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। 

বাড়ছে-কমছে যেসব পণ্য

সিমেন্টশিল্পের কাঁচামালে এখনো সাড়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। অর্থবছরের পাঁচ মাসে সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ১ কোটি ৪৭ লাখ টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। একই অবস্থা রড তৈরির কাঁচামালেও। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রড তৈরির কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ২২ লাখ ৪১ হাজার টন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। 

তবে পুরোনো জাহাজ আমদানি কমেছে। পুরোনো জাহাজ মূলত রড তৈরির কাঁচামালের দ্বিতীয় উৎস। লোহার টুকরা আমদানি বাড়ায় পুরোনো জাহাজের আমদানি কমলেও এই খাতে অবশ্য খুব বেশি প্রভাব পড়ার কথা নয়। 

বস্ত্র খাতের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে তুলা আমদানি হয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার টন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। তবে তুলা আমদানিতে ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে ২৩০ কোটি ডলারের তুলা আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। 

বিলাসপণ্যের মধ্যে গাড়ি আমদানি কমেছে। কমেছে ফল আমদানিও—৪৩ শতাংশ। বাজারে এখন বছরজুড়ে দেশীয় ফল পাওয়া যায়। তাতে ফল আমদানি কমলেও খুব বেশি ক্ষতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। ভোগ্যপণ্যের মধ্যে গম, চিনি ও ডাল আমদানি কমেছে। তবে সয়াবিন ও পাম তেলের আমদানি বেড়েছে।

দাম কমায় কমবে আমদানি ব্যয়ও

গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তাতে যুদ্ধের পর একটানা কয়েক মাস বৈশ্বিক বাজারে পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বাড়তে থাকে। গত অর্থবছরের আমদানি ব্যয়েও এর প্রভাব পড়ে। যেমন ঋণপত্র নিষ্পত্তির হিসাবে গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ছিল ৭ হাজার ৮৯৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি। রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি ব্যয় বাড়লেও একই সময়ে পণ্য আমদানি কমে যায় ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। 

চলতি অর্থবছরের শুরুতে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমতে শুরু করে। যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যায় কোনো কোনো পণ্যের দাম। আবার বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হওয়ায় দেশে দেশে চাহিদা কমছে। জাহাজভাড়াও কমেছে। অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় কমবে বলেও আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আমদানি দায় মেটানোর সক্ষমতা এখন কম। ফলে শুধু জরুরি খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, সার ও রপ্তানি আয় আসবে—এমন কাঁচামালের আমদানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এ সময় বিলাস পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমলে অর্থনীতির জন্যই ভালো হবে। নভেম্বরে আমদানি কিছুটা কমলেও আমদানি কমার প্রবণতা প্রত্যাশামাফিক নয়।