ফ্ল্যাট থেকে ‘কমিউনিটি’: আবাসনে যে কারণে বাড়ছে কমন স্পেসের গুরুত্ব
একটি বাড়ি মানে শুধু নিজের একটি ফ্ল্যাট, কয়েকটি ঘর আর বারান্দা নয়। দিনের ব্যস্ততা শেষে একটু অবসর সময় কাটানো, পরিবারকে সময় দেওয়া, শরীরচর্চা করা কিংবা পরিচিত কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার জন্যও মানুষ খোঁজে স্বস্তির একটি জায়গা। শহরের ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ জীবনে সেই জায়গার অভাবও তৈরি হচ্ছে। তাই আবাসনের নকশায় ব্যক্তিগত পরিসরের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে এমন কিছু জায়গা, যা সবাই মিলে ব্যবহার করতে পারেন। ছাদ, লাউঞ্জ, শিশুদের খেলার জায়গা, ব্যায়ামাগার, হাঁটার জায়গা কিংবা কাজ করার নির্দিষ্ট পরিসর—এ ধরনের কমন স্পেস এখন অনেক আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনায় যুক্ত হচ্ছে। উদ্দেশ্য শুধু বাড়তি সুবিধা দেওয়া নয়, একই আবাসনে বসবাস করা মানুষদের জন্য একটি সামাজিক পরিসর তৈরি করাও।
ফ্ল্যাটের বাইরেও জীবন
একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ কাটে নিজের ঘরে বা ফ্ল্যাটে। কিন্তু সব কাজ বা অবসর যে ঘরের মধ্যেই হতে হবে, এমন নয়। শিশুদের খেলাধুলা, বয়স্কদের হাঁটাহাঁটি কিংবা পরিবারের সদস্যদের একটু খোলা জায়গায় বসার প্রয়োজন আছে। এ কারণে আবাসন পরিকল্পনায় কমন স্পেসের গুরুত্ব বাড়ছে। একটি ভালোভাবে পরিকল্পিত যৌথ ব্যবহারের জায়গা বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে।
ছাদ যখন বসার জায়গা
ঢাকার অনেক আবাসনেই খোলা জায়গার সংকট রয়েছে। তাই একটি ভবনের ছাদকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত ছাদে বসার জায়গা, সবুজায়ন, হাঁটার পরিসর কিংবা শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকলে সেটি ভবনের বাসিন্দাদের জন্য স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটানো, বন্ধু বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বসা কিংবা একা কিছুক্ষণ সময় কাটানোর জন্য এমন জায়গা কাজে আসতে পারে। এতে নিজের ফ্ল্যাটের বাইরেও সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়।
খেলাধুলার জন্য নিরাপদ জায়গা
শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গার প্রয়োজনও আবাসন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ব্যস্ত সড়ক বা অপরিকল্পিত খোলা জায়গার পরিবর্তে আবাসনের ভেতরে নির্দিষ্ট খেলার পরিসর থাকলে অভিভাবকেরাও স্বস্তি পান। এমন জায়গা শুধু শিশুদের খেলাধুলার সুযোগই তৈরি করে না, অভিভাবকদের মধ্যেও পরিচিতি ও যোগাযোগ বাড়াতে পারে। সন্তানকে খেলতে নিয়ে এসে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়, তৈরি হয় প্রতিবেশী হিসেবে একটি সামাজিক সম্পর্ক।
কাজের জায়গাও আবাসনের অংশ
কাজের ধরন বদলানোর সঙ্গে আবাসনের চাহিদাতেও পরিবর্তন এসেছে। বাসা থেকে কাজ করা বা অনলাইনে মিটিং করার প্রবণতা বাড়ায় অনেকের জন্য ঘরের বাইরে শান্ত একটি কাজের জায়গার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কিছু আবাসন প্রকল্পে কো-ওয়ার্কিং বা কাজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখার চিন্তাও দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে জিম, হাঁটার জায়গা বা বিনোদনের পরিসর থাকলে শরীরচর্চা কিংবা অবসরের জন্য প্রতিদিন দূরে যেতে হয় না। ফলে আবাসন শুধু থাকার জায়গা না হয়ে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর পরিসর হয়ে উঠতে পারে।
তবে একটি আবাসন প্রকল্পে অনেকগুলো সুবিধা থাকলেই সেটি কার্যকর কমন স্পেস হয়ে যায় না। জায়গাগুলোর অবস্থান, ব্যবহারযোগ্যতা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাসিন্দাদের প্রকৃত প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হয়। একদিকে যেমন বাসিন্দাদের সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ থাকবে, অন্যদিকে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পরিসরও যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবর্তন কনসালট্যান্টসের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান বলেন, কমিউনিটি স্পেস এখন সময়ের দাবি। গত কয়েক দশকে আবাসনে যে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও প্রভাব ফেলছে। মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি অভাব শিশুদের শারীরিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার। তিনি বলেন, আবাসনে যদি নিরাপদ কমন স্পেস থাকে, যেখানে শিশুরা খেলাধুলা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে, তাহলে তাদের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগও তৈরি হবে। এখন অনেক শিশুই সরাসরি মেলামেশার চেয়ে অনলাইন, ডিসকর্ড বা গেমে বেশি আগ্রহী। তাই শিশুদের স্বাভাবিক ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য আবাসনে কমিউনিটি স্পেস থাকা খুবই জরুরি।
আসিফুর রহমান আরও বলেন, এখন অনেক আবাসনেই একটি বিল্ডিংয়ের গা ঘেঁষে আরেকটি বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। ফলে আবাসনের মধ্যে গাছপালা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও খোলা জায়গার সুযোগ কমে যাচ্ছে। শুধু প্রকৃতি থেকে নয়, এর প্রভাব মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও পড়ছে। একসঙ্গে সময় কাটানো, কথা বলা বা একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতাও কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আবাসনে গাছপালা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের পাশাপাশি এমন পর্যাপ্ত আউটডোর ও কমন স্পেস রাখা জরুরি। প্রকৃতির সংস্পর্শ আমাদের মানবিক করে তুলতে সাহায্য করে।’
একটি বাড়ি মানুষকে আশ্রয় দেয়। আর একটি ভালো আবাসন তার বাইরেও তৈরি করে জীবনযাপনের পরিসর। সেখানে বিকেলের আড্ডা হতে পারে ছাদে, শিশুরা খেলবে নির্দিষ্ট জায়গায়, কেউ বসে কাজ করবেন লাউঞ্জে, আবার কেউ সন্ধ্যায় হাঁটবেন সবুজ পথে। এভাবেই একটি আবাসন শুধু কয়েকটি ফ্ল্যাটের সমষ্টি না হয়ে ধীরে ধীরে একটি ‘কমিউনিটি’ হয়ে উঠতে পারে।
অনলাইন আবাসন মেলার মতো আয়োজনে এখন শুধু ফ্ল্যাটের আয়তন বা অবস্থানের খোঁজই নয়, পাশাপাশি জীবনযাপনের সুবিধাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্রেতারা প্রকল্পের নকশা, খোলা জায়গা, শিশুদের খেলার পরিসর, কমন স্পেস, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কেও জানতে চাইছেন। ফলে আবাসন নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু একটি ফ্ল্যাট নয়, পুরো আবাসন-পরিবেশও বিবেচনায় আসছে।