মন্দা কাটিয়ে আবারও গতি ফিরেছে মোটরসাইকেলের ব্যবসায়। দুই বছর পর বেড়েছে মোটরসাইকেলের বিক্রি। ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল চার লাখের কম। আর ২০২৫ সাল শেষে সব ব্র্যান্ড মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ৬৪ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোটরসাইকেলের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সাল থেকে দেশে ডলারের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। তার প্রভাবে আমদানি করা প্রায় সব পণ্যের দামও বেড়ে যায়। মোটরসাইকেলও তার বাইরে ছিল না। ডলারের বাড়তি দামের কারণে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজনের খরচও বেড়ে যায়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডলারের বাড়তি দামের কারণে ২০২৩ সালে মোটরসাইকেলের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। এরপর এক বছর ধরেই ডলারের দাম কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। ১২২ টাকার আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছে ডলারের বিনিময়মূল্য। তাই মোটরসাইকেলের দামও স্থিতিশীল রয়েছে। তাতে ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়তে শুরু করে। এ ছাড়া কিস্তি–সুবিধাসহ ব্র্যান্ডগুলোর নতুন মডেল বাজারে আনায় ক্রেতাদের আগ্রহও ফিরতে শুরু করেছে মোটরসাইকেল কেনার প্রতি।
দেশে মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, শহরাঞ্চলের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মোটরসাইকেলের চাহিদা বেড়েছে। আগামী পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এই চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও মোটরসাইকেল বিক্রি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরও তাই মোটরসাইকেল বিক্রি আরও বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দামের স্থিতিশীলতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেলের বাজারে।
জানতে চাইলে এসিআই মোটরসের মহাব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ অপশন প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেলের প্রায় সব ধরনের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়। তাই ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় মোটরসাইকেলের দামও কিছুটা বেড়েছিল। তাতে বিক্রি কিছুটা কমে গিয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে মোটরসাইকেলের বিক্রি গত বছর শেষে কিছুটা স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে। তবে এ খাতে বিভিন্ন কোম্পানি যে বিনিয়োগ করেছে, সেই তুলনায় বিক্রি খুব বেশি বাড়েনি।
খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২১ সালে প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালে সেই বিক্রি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯২ হাজারে। ২০২৪ সালেও বিক্রি তেমন বাড়েনি। তবে ২০২৫ এসে মোটরসাইকেল বিক্রিতে কিছুটা গতি ফিরেছে।
দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও প্রবাসী আয়ের ওপরও মোটরসাইকেল বিক্রি নির্ভর করে বলে জানান এই খাতের ব্যবসায়ীরা। মূল্যস্ফীতি গত জুনে ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা একসময় ১২ শতাংশের বেশি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে যা ছিল ২ হাজার ১৭৪ কোটি ডলার। মূল্যস্ফীতি কমে আসায় এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে মোটরসাইকেলের চাহিদাও বেড়েছে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে।
হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হোন্ডা লিমিটেডের (বিএইচএল) প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক কাজ করেছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দামের স্থিতিশীলতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেলের বাজারে।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিক্রি কিছুটা বাড়লেও সার্বিকভাবে মোটরসাইকেলের বাজার পরিস্থিতি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১৮ সালে মোটরসাইকেল নীতিমালায়, ২০২৭ সালের মধ্যে মোটরসাইকেলের বার্ষিক উৎপাদন ১০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে ২০২৫ সালে অন্তত আট লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদন হওয়ার কথা। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে খাতটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
সুজুকি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান র্যানকন মোটর বাইকসের নির্বাহী পরিচালক কাজী আশিক উর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে মোটরসাইকেল সংযোজনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন হয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। ভারতে এটি ৯৫ শতাংশের বেশি। যদি ২০২৭ সালের মধ্যে ১০ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয়, তাহলে দাম কমাতে হবে। বিশেষ করে ১০০ সিসির ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেলের দাম ১ লাখ টাকার আশপাশে নামিয়ে আনতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই শিল্পে সরকারি প্রণোদনা দরকার।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২১ সালে মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২৫২টি। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬ হাজার ৯২টিতে। তবে ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা কমে ৩ লাখ ১০ হাজারে নেমে আসে। ২০২৪ সালে যা আরও কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৩ হাজারে। তবে ২০২৫ সালে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬৪টিতে।