default-image

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরও পাঁচ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর মধ্যে তিন কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গড়ার কাজটি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বাকি দুটির বিষয়ে প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিএসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিএসইসি যে পাঁচটি কোম্পানির বর্তমান পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো হলো ইউনাইটেড এয়ার, ফ্যামিলিটেক্স, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস ও এমারেল্ড অয়েল। এ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে চারটিরই কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। শুধু ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের কার্যক্রমই চালু রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে বিএসইসির কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, শেয়ারবাজারের যেসব কোম্পানি ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে খারাপ অবস্থায় চলে গেছে, সেসব কোম্পানিকে আবার সচল করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে রিংসাইন টেক্সটাইল ও আলহাজ টেক্সটাইলের পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। তার সুফলও মিলতে যাচ্ছে। বন্ধ এ দুটি কোম্পানি চালুর বিষয়ে বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। রিংসাইন ও আলহাজ টেক্সটাইলের অভিজ্ঞতার আলোকে এখন আরও পাঁচটি কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গড়ার প্রক্রিয়া চলছে।

ইউনাইটেড এয়ার

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারকে আবারও কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা যায় কি না, তারই অংশ হিসেবে শিগগির কোম্পানিটির পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এভিয়েশন খাতের বেসরকারি একজন বিশেষজ্ঞকে কোম্পানিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। দু–এক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমে না থাকায় ইউনাইটেড এয়ারকে গত মাসে মূল বাজার থেকে ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার) বাজারে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ইউনাইটেড এয়ারের শেয়ারের সিংহভাগেরই মালিকানা এখন ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানের হাতে। কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে আছে মাত্র আড়াই শতাংশ শেয়ার। অথচ আইন অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে সম্মিলিতভাবে সব সময় ওই কোম্পানির ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক। আর পরিচালকদের হাতে এককভাবে সব সময় ২ শতাংশ শেয়ার থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা এ আইন লঙ্ঘন করে তাঁদের হাতে থাকা সব শেয়ার গোপনে বাজারে বিক্রি করে দেন। এ কারণে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাসভীরুল আহমেদ চৌধুরীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে বিএসইসি। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানির বর্তমান দেনার পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

ফ্যামিলিটেক্স ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল

বস্ত্র খাতের চট্টগ্রামভিত্তিক কোম্পানি ফ্যামিলিটেক্স ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের পর্ষদও পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এ দুটি কোম্পানিরও কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। শেয়ারধারীদেরও কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। দুটি কোম্পানিই এখন নামসর্বস্ব। এর মধ্যে ফ্যামিলিটেক্সের উদ্যোক্তারা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি বন্ধ রাখলেও তাঁদের মালিকানায় অন্য কোম্পানিগুলো সচল রয়েছে। এমনকি নতুন কোম্পানিও খুলছেন। শুধু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি পরিচালনার ক্ষেত্রেই অনীহা কোম্পানিটির উদ্যোক্তাদের।

জানা গেছে, মূলত শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে সেই টাকা লুটপাট করে অন্য ব্যবসায় খাটিয়ে লাভবান হয়েছেন ফ্যামিলিটেক্সের উদ্যোক্তারা। যদিও ২০১৮ সালের পর থেকে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না। ফ্যামিলিটেক্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির পরিচালনায় চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন মেহরাজ ই মোস্তফা। আর পরিচালক তাঁর স্ত্রী তাবাসসুম করিম। একসময় বিএসএ গ্রুপ নামের চট্টগ্রামকেন্দ্রিক এক পোশাক কারখানার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হিসেবে কাজ করতেন। চাকরিজীবী থেকে হয়ে যান উদ্যোক্তা। অভিযোগ আছে, বিপুল আর্থিক অনিয়মের কারণেই চাকরিচ্যুত করা হয় মেহরাজ ই মোস্তফাকে। বিএসএ গ্রুপের অনিয়মের অর্থে গড়ে তোলেন ফ্যামিলিটেক্স। পরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ২০১৩ সালে কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কয়েক বছর না যেতেই প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল মানের কোম্পানি হিসেবে ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত হয়।

এদিকে, ২০১৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের পর্ষদও ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠনের কাজ প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে বিএসইসি। এর আগে গত জুলাইয়ে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুখসানা মোর্শেদ, পরিচালক শারমিন আকতার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালক বাংলাদেশ শু ইন্ডাস্ট্রিজকে ১৪ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল বিএসইসি। আইন লঙ্ঘন করে কোনো ঘোষণা ছাড়া তাঁদের হাতে থাকা বিপুল শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে ১২ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করায় এ জরিমানা করা হয়।

সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল আইপিওতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাজারে এসেছিল। ওই সময় তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও হয়েছিল। কিন্তু সেসবে ‘রা’ করেনি বিএসইসির তৎকালীন কমিশন। যে কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন এম খায়রুল হোসেন, যাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি মানহীন কোম্পানি বাজারে আসার সুযোগ করে দিয়ে বাজারটাকে ডুবিয়েছেন।

এমারেল্ড অয়েল ও ইন্দো-বাংলা

বেসিক ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে এমারেল্ড অয়েলের নাম জড়িয়ে আছে। ওই কেলেঙ্কারির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরই তুষের তেল বা রাইস ব্র্যান অয়েল প্রস্তুত ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানটিরও আলো ধীরে ধীরে নিভতে থাকে। বর্তমানে কোম্পানিটি নামসর্বস্ব কোম্পানি। ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানি ২১৬ সালের পর থেকে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। ২০১৯ সালে বিএসইসি কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালক থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব জব্দ করে। এখন পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে বন্ধ কোম্পানিকে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

২০১৮ সালে তালিকাভুক্ত হওয়া ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস পরিচালনার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার প্রমাণ পেয়েছে বিএসইসি। এ কারণে এ কোম্পানির পর্ষদও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন