default-image

ভাবুন তো একবার, করোনায় এ সময়ে কোনো ব্যবসা আছে যেখানে মাত্র আড়াই মাসে আপনার টাকা তিন–চার গুণ হয়ে যাবে। অথচ করোনার হানায় বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতি পোষাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ কারণে কর্মী ছাঁটাইসহ নানা পন্থায় খরচ কমাচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এমন সময়ে শেয়ারবাজারে বিমা খাতের কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্বিগুণ, তিন গুণ, চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এসব শেয়ারে যাঁদের বিনিয়োগ ছিল, তাঁদের টাকা মাত্র আড়াই মাসে কয়েক গুণ হয়ে গেছে।

এমন লাভের কথা শুনে নিশ্চয় আপনার চোখ কপালে ওঠে গেছে। তা হওয়ারই কথা। মানুষ যখন জীবন–জীবিকার সঙ্গে লড়াই করছে টিকে থাকতে, সেখানে শেয়ারবাজারে বিমা খাতের কোম্পানিগুলো যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ হয়ে উঠেছে। ভাবছেন, এখনই জমানো সব টাকা নিয়ে এসব শেয়ার কিনতে ছুটবেন। তাহলে একটু থামুন। কারণ, এভাবে মূল্যবৃদ্ধি পাওয়াটা একেবারেই অস্বাভাবিক। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাজারের বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী। শুধু কি বিনিয়োগকারী, বিমা কোম্পানির অনেক মালিকও জানেন না এই উত্থানের সঠিক কারণ।

দেশের শেয়ারবাজারে সাধারণ বিমা খাতের যেসব কোম্পানি রয়েছে, সেগুলোর শেয়ারের দাম গত আড়াই মাসে (৩ আগস্ট–২২ সেপ্টেম্বর) সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ পৌনে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানির দাম বেড়ে দ্বিগুণ থেকে চার গুণ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন
এই ১০টি কোম্পানি হচ্ছে—নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি এক্সপ্রেস ইনস্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক ইনস্যুরেন্স, এশিয়া ইনস্যুরেন্স, কন্টিনেন্টাল ইনস্যুরেন্স, গ্লোবাল ইনস্যুরেন্স, নিটোল ইনস্যুরেন্স, প্রভাতী ইনস্যুরেন্স, সেন্ট্রাল ইনস্যুরেন্স, প্রিমিয়ার ইনস্যুরেন্স ও পূরবী জেনারেল ইনস্যুরেন্স।

এসব বিমা কোম্পানির শেয়ারের দাম সর্বনিম্ন ৮৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আর জীবনবিমা খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আটটি কোম্পানির শেয়ারের দাম আড়াই মাসে ২ শতাংশ থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আর বাকি চারটির দাম অবশ্য এই সময়ে কমেছে।

দেশের শেয়ারবাজারে বর্তমানে তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানির সংখ্যা ৪৮। এর মধ্যে সাধারণ বিমা খাতের কোম্পানি ৩৬টি আর জীবনবিমা কোম্পানি ১২টি। মোট ৪৮টি কোম্পানির মধ্যে চারটি বাদে বাকি সব কটিরই শেয়ারের দাম গত আড়াই মাসে বেড়েছে। বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ যে উত্থান ঘটেছে, সেই হিসাবে গত আড়াই মাসে গড়ে প্রতিটি শেয়ারের দাম ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট এশিয়া প্যাসিফিক ইনস্যুরেন্স কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ২৬ টাকা ২০ পয়সা। গত বৃহস্পতিবার তা বেড়ে হয়েছে ৭২ টাকা। অর্থাৎ প্রায় আড়াই মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে পৌনে তিন গুণ। আর এক মাস পেছনে গিয়ে ৩ জুলাইয়ের সঙ্গে তুলনা করলে দাম বেড়েছে প্রায় চার গুণ।

গত ২৪ আগস্ট লেনদেন শুরু হওয়া নতুন এক্সপ্রেস ইনস্যুরেন্সের শেয়ারের প্রথম দিনের দাম ছিল ১৫ টাকা। গত বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ টাকা। সেই হিসাবে আড়াই মাসে দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

গত ২৪ আগস্ট লেনদেন শুরু হওয়া নতুন এক্সপ্রেস ইনস্যুরেন্সের শেয়ারের প্রথম দিনের দাম ছিল ১৫ টাকা। গত বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ টাকা। সেই হিসাবে আড়াই মাসে দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। আর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও দামকে বিবেচনায় নিলে দুই মাসেরও কম সময়ে এটির দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় চার গুণ। কোম্পানিটি আইপিওতে প্রতিটি শেয়ার ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে বিক্রি করেছিল।

দামের এই উত্থান দেখে বাজার–সংশ্লিষ্টদের বেশির ভাগই বলছেন, কারসাজির মাধ্যমেই বিমা খাতের কিছু কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে। কোনোভাবেই এ দাম কোম্পানির আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এ দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার–সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ। কারণ, কয়েক মাস ধরে বিমা খাতের শেয়ারের দামের টানা উত্থান বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ভালো ভালো শেয়ার যেখানে অবমূল্যায়িত অবস্থায় পড়ে আছে, সেখানে বিমা কোম্পানির শেয়ারের দাম যেন আকাশমুখী।

বিজ্ঞাপন

বাজার–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে কারসাজিকারকেরা ইচ্ছেমতো বিমা খাতের কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছেন। টানা মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে থাকলে একপর্যায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও হাতের সব শেয়ার বিক্রি করে এ খাতে ঝুঁকে পড়েন।

বিমা খাতের কোম্পানির শেয়ারের দাম গত দুই–আড়াই মাসে যেভাবে বেড়েছে, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় কারসাজি ছাড়া এভাবে মূল্যবৃদ্ধির আর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বিমা কোম্পানিগুলো সাধারণত খুবই স্বল্প মূলধনি কোম্পানি। তাই কারসাজির জন্য কারসাজিকারকেরা এসব কোম্পানি বেছে নেন।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মোহাম্মদ মুসা

জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও বেসরকারি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসা বলেন, বিমা খাতের কোম্পানির শেয়ারের দাম গত দুই–আড়াই মাসে যেভাবে বেড়েছে, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় কারসাজি ছাড়া এভাবে মূল্যবৃদ্ধির আর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বিমা কোম্পানিগুলো সাধারণত খুবই স্বল্প মূলধনি কোম্পানি। তাই কারসাজির জন্য কারসাজিকারকেরা এসব কোম্পানি বেছে নেন।

এদিকে বিমা খাতের টানা উত্থানে সম্প্রতি যেন আরও ঘি ঢেলেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) একটি বক্তব্য। সংস্থাটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এম মোশাররফ হোসেন সম্প্রতি এক আলোচনায় বিমা কোম্পানিগুলোকে কত লভ্যাংশ দিতে হবে, তার একটি বার্তা দেন।

বিমা খাতের শেয়ারের সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পুরো বাজারকেই অস্থির করে তুলেছে। এ খাতে শেয়ারের টানা মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হাতের অন্য শেয়ার বিক্রি করে এদিকে ঝুঁকছেন। এতে অন্য শেয়ারের দাম কমছে। আবার বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। কারণ, দাম কমতে শুরু করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এদিকে বিমা খাতের টানা উত্থানে সম্প্রতি যেন আরও ঘি ঢেলেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) একটি বক্তব্য। সংস্থাটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এম মোশাররফ হোসেন সম্প্রতি এক আলোচনায় বিমা কোম্পানিগুলোকে কত লভ্যাংশ দিতে হবে, তার একটি বার্তা দেন। যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কোনো কোম্পানির লভ্যাংশের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। অনেকেই মনে করেন, মোশাররফ হোসেনের দেওয়া লভ্যাংশ–সংক্রান্ত ওই বক্তব্যকে শেয়ারবাজারের কারসাজিকারকেরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

মন্তব্য পড়ুন 0