প্রতিষ্ঠার সুবর্ণজয়ন্তী
টিকে থাকতে টাকা চায় আইসিবি; অর্থমন্ত্রী বললেন, সরকারের আশীর্বাদে প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না
সরকারি বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবিকে টিকিয়ে রাখতে ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা চাইলেন সংস্থাটির শীর্ষ ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, সংস্থাটি বর্তমানে উচ্চ সুদে নেওয়া ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ বোঝায় ধুঁকছে। এসব ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছে সংস্থাটি। তাই আইসিবিকে এই সংকট থেকে উদ্ধার করতে স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা দরকার, যা দিয়ে উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধ করা হবে।
১৯৭৬ সালের ১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশে জন্ম নেওয়া এই বিনিয়োগ সংস্থার সুবর্ণজয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের কাছে এই সহায়তা চাওয়া হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে এ সহায়তা চাওয়া হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকারের আশীর্বাদ দিয়ে কোনো এন্টারপ্রাইজ (প্রতিষ্ঠান) চলতে পারে না।
এ সময় অর্থমন্ত্রী আইসিবি প্রতিষ্ঠার মূল ধারণা কী ছিল তা তুলে ধরে বলেন, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আইসিবির মাধ্যমে বিনিয়োগে যাবে, সেই বিনিয়োগ অর্থনীতিতে অবদান রাখবে, এটাই ছিল আইসিবি প্রতিষ্ঠার মূল ধারণা। এত বছর নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইসিবিকে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।
রাজধানীর দিলকুশার পূর্বাণী হোটেলে আজ বৃহস্পতিবার সকালে সুবর্ণজয়ন্তীর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। এ ছাড়া বক্তব্য দেন আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও আইসিবির সাবেক এমডি জিয়াউল হক খন্দকার, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার ও এপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর।
অনুষ্ঠানে আইসিবির এমডি সংস্থাটির ঐতিহ্য ও অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান আর্থিক সংকট ও সংকট মোকাবিলার কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে আইসিবির ঘাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা। এই ঋণের বড় অংশ উচ্চ সুদের। এখন যদি সরকারের কাছ থেকে স্বল্প সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাওয়া যায়, তাহলে উচ্চ সুদের ঋণ শোধ করে দিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে আবারও আইসিবিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব। বর্তমানে আর্থিক সংকটে থাকায় আইসিবি শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগ করতে পারছে না। ফলে শেয়ারবাজার থেকে আয়ের সুযোগও কমে গেছে। যদিও একসময় শেয়ারবাজারই ছিল আইসিবির আয়ের বড় উৎস। একসময় শেয়ারবাজারে আইসিবি ত্রাতার ভূমিকা পালন করেছে। এখন নিজেরা সংকটে পড়েছে।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারকে বাঁচাতে গিয়ে একসময় বেশি দামে শেয়ার কিনে এখন বড় লোকসানে আছে আইসিবি। এ ছাড়া অতীতে অনেকে আইসিবিকে শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাতে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় এটিকে টিকিয়ে রাখতে ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদের ঋণ দরকার।
এ সময় আইসিবির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘সারা জীবন আমি বাজার অর্থনীতির পক্ষের লোক। সবকিছু বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছি, বাজার প্রতিযোগিতার কথা বলেছি, বাজারভিত্তিক মুনাফার কথা বলে এসেছি। এখন আইসিবির চেয়ারম্যান হয়ে সেই আমাকে সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানের জন্য টাকা চাইতে হচ্ছে। এতে আমার লজ্জাও লাগে। তবু প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমি সরকারের সহায়তার কথা বলছি। আইসিবির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। তাই সংস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদের কারও স্বার্থে নয়, দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার পর অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইসিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার পেছনে মূল ধারণা ছিল দেশের অর্থনীতিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে নেওয়া এবং পুঁজিবাজারকে সেই অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা। আইসিবির কার্যক্রমও সেভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। অথচ আমাদের শেয়ারবাজার এখন অনেক বেশি ব্যক্তি বিনিয়োগকারীনির্ভর। তাই ব্যক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর বাজার তৈরির ক্ষেত্রে আইসিবির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আইসিবিকে বাজারভিত্তিক, প্রতিযোগিতামূলক, দক্ষ ও পেশাদার হতে হবে।’
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘গত ৫০ বছরে দেশের শিল্পায়ন ও পুঁজিবাজারে আইসিবির অনেক অবদান রয়েছে। তবে এ কথাও সত্য, এখন বাজারে অনেক প্রতিযোগী। তার মধ্যে পেশাদারত্ব অনেক উন্নত। আইসিবিকেও টিকে থাকতে হলে পেশাদারত্বের উন্নতি করতে হবে। অনেক সময় আমাদের মধ্যে এমন ধারণা থাকে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু এটি সব সময় ভালো ফল দেয় না। অনেক সময় লোকসানে শেয়ার বিক্রি না করলে ভালো শেয়ার ভালো দামে কেনার সুযোগও হাতছাড়া হয়। তাই আইসিবির বর্তমান অবস্থার উন্নতির জন্য তাদের পোর্টফোলিও বা পত্রকোষ নতুন করে সাজানো বা রিব্যালেন্স করা দরকার।’