ভালো কোম্পানির অভাবই বিনিয়োগে বড় বাধা

ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত নির্বাচন পরবর্তী দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও পুঁজিবাজার শীর্ষক সেমিনারে উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিরা। গতকাল রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলেছবি: ব্র্যাক ইপিএল

দেশের শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির অভাবই এই বাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। দেশীয় প্রতিষ্ঠান হোক বা বিদেশি বিনিয়োগকারী—বড় অঙ্কের বিনিয়োগের জন্য কোম্পানির সংখ্যা হাতে গোনা। তাই দেশি-বিদেশি বড় ও ভালো বিনিয়োগকারীরা এই বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুব বেশি আগ্রহ দেখান না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বলছেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়নের দিক থেকে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হতে হবে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারের ব্যাপ্তি বাড়ানো।

রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত ‘নির্বাচন–পরবর্তী অর্থনীতি, রাজনীতি ও পুঁজিবাজার’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। সেমিনারে অতিথি আলোচক ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক। এ ছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আতিকুর রহমান। আলোচনা সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম। সেমিনারে অনলাইনে বক্তব্য দেন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা।

সেমিনারে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে চলে গেছে। এখান থেকে বের হওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সব ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ ও বাজারমুখী নীতি। ভিয়েতনাম, চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সমস্যায় পড়েছে। বাংলাদেশ তাদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। প্রতিনিয়ত বিদেশিরা বাংলাদেশে আসছেন, কিন্তু তাঁরা বিনিয়োগ করছেন না। নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন। নির্বাচিত সরকার এলে সবাই বিনিয়োগ করবেন।

মূল প্রবন্ধে এম এ রাজ্জাক বলেন, পরবর্তী সরকারের প্রধান কাজ হবে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই সংস্কার নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। একই সঙ্গে তথ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোও জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। চ্যালেঞ্জ হলো স্বল্পমেয়াদি সংকট ব্যবস্থাপনা। যত দ্রুত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে, ততই অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্যবাজার ও পুঁজিবাজারের মধ্যে পুঁজিবাজারেই আমরা সবচেয়ে পিছিয়ে। এখানে আস্থা ও তারল্য কম, ভালো শেয়ারের সংখ্যাও সীমিত—ছয়-সাতটির বেশি নয়। এই জায়গায় আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে। জেপি মরগ্যানসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। এটাই বিনিয়োগকারীদের জন্য উপযুক্ত সময়। তারা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করছে।’

সেমিনারে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সুইডেনভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান টুন্ড্রা ফন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ম্যাটিয়াস মার্টিনসন বলেন, ‘বাংলাদেশের শেয়ারবাজার পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে আছে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হতে হবে বাজারের বিস্তৃতি বাড়ানো, ভালো কোম্পানি বাজারে আনা।’

অনলাইনে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনটেক্সচুয়াল ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকাও হিরোসে বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ থাকে। আমরা আগে নিশ্চিত হতে চাই যে সবকিছু স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। তারপর আমরা বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা মান নির্ধারণ করবেন স্বচ্ছ তথ্যের মাধ্যমে। তাই আর্থিক প্রতিবেদন ও প্রকাশনার মানের বিষয়ে আমরা বিধিমালা এমনভাবে সাজিয়েছি, যাতে নিয়ন্ত্রকদের জন্য নিম্নমানের বা অসাধু অংশগ্রহণকারীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।’

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আতিকুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় যে তাঁর দল ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করলে শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতিতে যাওয়া বা আর্থিক ব্যবস্থায় হঠাৎ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না। জবাবে আতিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ন্যায়বিচার, নৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং মানবকল্যাণের দর্শনে বিশ্বাসী। তবে তার অর্থ এই নয় যে হঠাৎ করে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে। আমরা বাস্তববাদী ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে।’