বিনিয়োগকারীদের আগাম সতর্ক করল জিপি, কমতে পারে আয়

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দেশের জ্বালানি খাত ও অর্থনীতি চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় নিজেদের ব্যবসা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আগাম সতর্ক করেছে দেশের বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে প্রথমবারের মতো এ ধরনের আগাম সতর্কতামূলক পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে গ্রামীণফোন। কোম্পানিটি বলছে, এটি পৃথিবীজুড়ে বড় বড় কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। সেই আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ ধরনের পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে গ্রামীণফোন।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে আজ মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে এই আগাম সতর্কবার্তা প্রকাশ করা হয়। সেই বার্তায় কোম্পানিটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতার ঢেউ বাংলাদেশেও এসে লেগেছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা বেড়েছে এবং আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও অবকাঠামো বা লজিস্টিকস ব্যবস্থায়ও সেই চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

গ্রামীণফোন বলছে, দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। তবে দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পটভূমি এই সংকট অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও ভোক্তার আচরণেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মানুষের চলাচল, ব্যবসা পরিচালনা ও ব্যবহারযোগ্য আয়ের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় গ্রামীণফোন আশঙ্কা করছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি–মার্চ) আর্থিক কার্যক্রম বা পারফরম্যান্স মাঝারি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাতে গত বছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের রাজস্ব আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে কোম্পানিটির আশঙ্কা। পাশাপাশি কর–পূর্ববর্তী মুনাফা প্রায় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে কোম্পানিটি।

তবে গ্রামীণফোন এ–ও জানিয়েছে, তারা সার্বিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সেই সঙ্গে নিজেদের সেবা অব্যাহত রাখা ও কার্যক্রমের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্স বজায় রাখা এবং গ্রাহক ও সমাজকে সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে আয় কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে পুরোপুরি ও সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর।

গ্রামীণফোন–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোম্পানিটি যে আগাম সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছে, সেটি বৈশ্বিক উত্তম চর্চারই অংশ। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এই চর্চা চালুর চেষ্টা করে আসছিল কোম্পানিটি। কিন্তু সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় এত দিন তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এখন মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সেই সুযোগ সামনে এসেছে। কারণ, এই সংকটের প্রভাব অর্থনীতি ও বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরও জানায়, উদ্ভূত নানা পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতি ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এটি স্বাভাবিক। বিদ্যমান ব্যবস্থায় আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীদের এই ক্ষতির বিষয়ে আগাম ধারণা পাওয়ার কোনো বিধান নেই। ফলে আর্থিক প্রতিবেদনে যখন হঠাৎ বিনিয়োগকারীরা দেখেন ব্যবসা কমে গেছে, তখন তাঁরা চরমভাবে হতাশ হন। সেটি যাতে না হয়, তাই বিনিয়োগকারীদের সামনে পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা তুলে ধরা হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক প্রতিবেদন দেখে হঠাৎ হতাশ হওয়ার ঘটনা কমবে।

জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান আংকিত সুরেকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে আন্তর্জাতিক চর্চার অংশ হিসেবে আমরা প্রথমবারের মতো এ ধরনের সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছি। শেয়ারবাজার–সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এটি করা হয়েছে। আমরা আশা করি, এতে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অন্য কোম্পানিগুলোও এ ধরনের চর্চা শুরু করবে। সেটি হলে তাতে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন।’

গ্রামীণফোনের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) কোম্পানিটি ৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল। অর্থাৎ গত বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটি এই আয় করেছিল। আর নতুন করে ২ শতাংশ আয় কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা কোম্পানিটি প্রকাশ করেছে, সেটি বাস্তব হলে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭৭ কোটি টাকার মতো কমতে পারে। কারণ, কোম্পানিটি ২ শতাংশ আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে।