দুর্বল শ্রেণিতে নামার ধাক্কা, সেই ৮ কোম্পানির শেয়ারের দরপতন আজও

শেয়ারবাজারগ্রাফিকস: প্রথম আলো

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির শর্ত পরিপালন না করায় গতকাল রোববার এক দিনেই দুর্বল মানের ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে ৯টি কোম্পানিকে। তাতে ওই দিনই এসব কোম্পানির শেয়ারের সর্বোচ্চ দরপতন হয়। আজ সোমবারও শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরুতে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে। কারণ, এসব শেয়ারে এখন ক্রেতাসংকট দেখা দিয়েছে।

বিএসইসির নিয়ম মেনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ (ডিএসই) গতকাল রোববার যে ৯টি কোম্পানিকে জেড শ্রেণিতে স্থানান্তর করেছিল, সেগুলো হলো বেস্ট হোল্ডিংস, জেমিনি সি, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোড, কাট্টলি টেক্সটাইল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বিচ হ্যাচারি ও ফু–ওয়াং ফুড। এর মধ্যে পাঁচটি কোম্পানি ‘এ’ শ্রেণি থেকে এবং চারটি কোম্পানি ‘বি’ শ্রেণি থেকে জেড শ্রেণিতে নেমে গেছে।

জেড শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় গতকাল থেকেই এসব কোম্পানির শেয়ারের বিপরীতে মার্জিন ঋণসুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি এসব শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তিতেও তুলনামূলক বেশি সময় লাগবে।

বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্বল মানের কোম্পানিতে স্থানান্তরিত হওয়ায় বেশকিছু বিধিনিষেধের আওতায় পড়েছে ৯টি কোম্পানি। যার কারণে কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গেছে মার্জিন ঋণসুবিধা। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা ঋণের টাকায় আর এসব শেয়ার কিনতে পারছেন না। আবার কোম্পানিগুলোর শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তিতেও লাগছে বেশি সময়। ফলে কোম্পানিগুলোর শেয়ার কিনতে এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন বিনিয়োগকারীরা। উল্টো যাদের হাতে কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছিল, তারা এখন তা দ্রুত বিক্রি করে দিতে চাচ্ছেন। এ অবস্থায় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশি। যার ফলে সর্বোচ্চ দরপতন ঘটছে।

ঢাকার বাজারে আজ সোমবার লেনদেন শুরুর প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে এই ৯ কোম্পানির ৮টির শেয়ারের দরপতন হয়েছে। বাকি একটির লেনদেন বন্ধ থাকায় সেটির শেয়ারের দামে কোনো প্রভাব পড়েনি। রোববারও এসব কোম্পানির শেয়ারের সর্বোচ্চ দরপতন হয়েছিল।

আজ কোনটার দাম কত কমল

  • বেস্ট হোল্ডিংসের প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রথম এক ঘণ্টায় ১ টাকা বা সোয়া ৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১১ টাকা ১০ পয়সায়।

  • জেমিনি সির প্রতিটি শেয়ারের দাম একই সময়ের ব্যবধানে ৮ টাকা ৩০ পয়সা বা প্রায় পৌনে ৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১১৬ টাকায়।

  • এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের শেয়ারের দাম প্রথম ঘণ্টায় ১ টাকা ৩০ পয়সা বা প্রায় ১০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১২ টাকা ২০ পয়সা।

  • আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম ৩ টাকা ৭০ পয়সা বা ১০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩৩ টাকা ৩০ পয়সায়।

  • ওয়াইম্যাক্সের শেয়ারের দাম আজ প্রথম এক ঘণ্টায় ১ টাকা ১০ পয়সা বা প্রায় ৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ টাকায়।

  • কাট্টলি টেক্সটাইলের প্রতিটি শেয়ারের দাম এ সময় ১ টাকা বা সাড়ে ৯ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯ টাকা ৫০ পয়সায়।

  • বিচ হ্যাচারির প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রথম এক ঘণ্টায় ৪ টাকা ২০ পয়সা বা প্রায় ১০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩৮ টাকা ৩০ পয়সায়।

  • ফু–ওয়াং ফুডের প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রথম এক ঘণ্টায় ৭০ পয়সা বা ৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯ টাকা ৪০ পয়সায়।

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের লেনদেন বন্ধ থাকায় এটির দামে কোনো প্রভাব পড়েনি আজও।

নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে এক দিনে একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

কেন জেড শ্রেণিতে নামল কোম্পানিগুলো

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্ধারিত একাধিক শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হলে কোনো কোম্পানিকে জেড শ্রেণিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—

  • একটানা ছয় মাস উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকা

  • পরপর দুই বছর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়া

  • নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন না করা

  • কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে বেশি হওয়া

  • ঘোষিত লভ্যাংশের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ না করা

এসব শর্তের যেকোনো একটি পরিপালন না করা হলে নির্ধারিত সময় পরপর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জেড শ্রেণিভুক্ত করে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। তবে পরবর্তী সময়ে শর্ত পূরণ করতে পারলে কোম্পানিগুলোর আবার অন্য শ্রেণিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

বাজারে জেড শ্রেণির আধিক্য উদ্বেগজনক

নতুন করে ৯টি কোম্পানি যুক্ত হওয়ায় ডিএসইতে জেড শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১০টিতে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত মোট ৩৬০টি কোম্পানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই দুর্বল মানের কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত।

বাজার বিশ্লেষক ব্যক্তিদের মতে, জেড শ্রেণির কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের পরিসর সংকুচিত হওয়া। একটি বাজারে এতগুলো কোম্পানি দুর্বল মানের হওয়ায় তা দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ওপর আস্থার সংকট তৈরি করবে। পাশাপাশি লেনদেনের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে।