মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনার ধাক্কা দেশের শেয়ারবাজারে

আজ রোববার লেনদেনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঢাকার বাজারের প্রধান সূচকটি ২২৩ পয়েন্ট বা ৪ শতাংশ পড়ে যায়। যদিও পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে।

শেয়ারবাজার

মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ধাক্কা এসে লেগেছে দেশের শেয়ারবাজারেও। সেই ধাক্কায় সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে আজ রোববার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া ৯১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেরই দরপতন হয়েছে। তাতে এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩৯ পয়েন্ট বা প্রায় আড়াই শতাংশ কমেছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এদিন বাজারে লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিএসইএক্স সূচকটি ২২৩ পয়েন্ট বা প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। তাতে ডিএসইএক্স সূচকটি এক ধাক্কায় ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্ট থেকে নেমে আসে ৫ হাজার ৩৭৭ পয়েন্টে। ততক্ষণে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি বাদে বাছ-বিচার ছাড়া সব কোম্পানির শেয়ারের দরপতন হয়। শুরুর কয়েক মিনিটের এই ধাক্কার বেগ ধীরে ধীরে কিছুটা কমলেও শেষ পর্যন্ত বড় পতন থেকে বের হতে পারেনি সূচকটি। দিন শেষে ডিএসইএক্স সূচকটি দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৬২ পয়েন্টে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অতর্কিত যৌথ হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। বিশেষ করে তেল ও জ্বালানির বাজার নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই শঙ্কা তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাব ফেলে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মনোজগতে। তাতে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। যদিও দিনের শুরুতে বিক্রির এই হিড়িকের বিপরীতে ক্রেতারাও ছিলেন বেশ সক্রিয়। এ কারণে দিনের শুরু থেকে লেনদেনে ভালো গতি দেখা যায়। দাম যত কমে, ক্রেতাও তত সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ কারণে দিনের শুরুতে সূচক যত দ্রুত কমেছিল, তা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়। সর্বোচ্চ দর হারানো ভালো মানের কোম্পানিগুলোর শেয়ারও কিছুটা দর ফিরে পায়। তাতে সূচকের পতনের গতি থামে।

আজকের বাজারে যেটি হয়েছে, সেটিকে বলা যায় বিনিয়োগকারীদের ‘আতঙ্কিত আচরণ’। এই আচরণ যতটা না যৌক্তিক, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব।
—শাকিল রিজভী, সাবেক পরিচালক, ডিএসই

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আজ শেয়ারবাজারে সূচকের যে পতন হয়েছে, সেটি পুরোপুরি বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। যুদ্ধের প্রভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে দেয়। যদিও যুদ্ধের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটির প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি। পাল্টাপাল্টি হামলা যদি দীর্ঘমেয়াদি না হয়, তাহলে সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তাই মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তারপরও আতঙ্কে শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির এই প্রবণতা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বজুড়েই শেয়ারবাজারে এ ধরনের ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যায়।

বাজারসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের শুরুতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভয়ে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি শুরু করলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এদিন বেশ সক্রিয় ছিলেন। ভালো কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম দিনের শুরুতে সর্বোচ্চ পরিমাণে কমে যাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ার কিনতে শুরু করেন। যার ফলে এসব শেয়ারের দাম পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়। যেমন ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের দাম এদিন লেনদেনের কয়েক মিনিটের মধ্যে আগের দিনের চেয়ে সাড়ে ৭ টাকা বা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ কমে ৮০ টাকায় নেমে আসে। দিন শেষে এই শেয়ারের দাম দাঁড়ায় ৮৪ টাকায়। অর্থাৎ দিনের শুরুতে ব্যাংকটির শেয়ারের দাম সাড়ে ৭ টাকা কমলেও দিন শেষে চার টাকা পুনরুদ্ধার হয়। একই চিত্র দেখা যায় ইসলামী ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বেশ কিছু ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের দামেও। ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম এদিন শুরুতে আগের দিনের চেয়ে সাড়ে ৩ টাকা বা প্রায় ৮ শতাংশ কমে যায়। দিন শেষে সেখান থেকে ব্যাংকটির শেয়ারের দাম ১ টাকা ৬০ পয়সা পুনরুদ্ধার হয়। স্কয়ার ফার্মার শেয়ারের দাম দিনের শুরুতে আগের দিনের চেয়ে প্রায় ১১ টাকা বা ৫ শতাংশের মতো কমে যায়। দিন শেষে সেখান থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দামের ৭ টাকা পুনরুদ্ধার হয়। এভাবেই ভালো ভালো শেয়ারের দামের পুনরুদ্ধারে ডিএসইএক্স সূচকটির বেশ খানিকটা পুনরুদ্ধার হয়।

জানতে চাইলে ডিএসইর সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, আজকের বাজারে যেটি হয়েছে, সেটিকে বলা যায় বিনিয়োগকারীদের ‘আতঙ্কিত আচরণ’। বিশ্বজুড়েই শেয়ারবাজারে একশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে এ ধরনের আচরণ দেখা যায়। এই আচরণ যতটা না যৌক্তিক, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যেসব বিনিয়োগকারী বেশি অস্থিরতায় ভোগেন, তাঁরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের উচিত ধৈর্য ধরে থাকা।

ঢাকার বাজারে আজ ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়। তার মধ্যে ৩৫৩টি বা ৯১ শতাংশেরই দাম কমেছে। দাম বেড়েছে ৩০টির বা সাড়ে ৭ শতাংশের আর অপরিবর্তিত ছিল ৬টির বা দেড় শতাংশের। বেশির ভাগ শেয়ারের দরপতনের এই দিনেও ঢাকার বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭৭৬ কোটি টাকা, এটিকে বাজারে শক্তির দিক বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, যেভাবে দিনের শুরুতে দরপতন হয়েছে, তাতে বাজার ক্রেতাশূন্য হয়ে যাওয়ার কথা; কিন্তু সেটি হয়নি। উল্টো ক্রেতারা অনেক বেশি সক্রিয় ছিলেন। তাই বোঝা যাচ্ছে, এই দরপতন স্থায়ী হবে না।