বিক্রি বেড়েছে, তবু কেন বড় লোকসানে সিঙ্গার
বাড়তি সুদের চাপ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা বাড়লেও লোকসান বেড়েছে কোম্পানিটির। এখন খরচ কমানোর চেষ্টায় কোম্পানিটি।
উৎপাদন খরচ ও ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য খাতের বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ। বাড়তি উৎপাদন খরচ ও ঋণের সুদের চাপে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটি প্রায় ৫৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। গত বছরের একই সময়ের কোম্পানিটি লোকসান করেছিল ৩৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান বেড়েছে ২১ কোটি টাকা।
এ অবস্থায় বড় অঙ্কের লোকসান কোম্পানিকে লাভে ফেরাতে দুটি করণীয় নিয়ে ভাবছেন কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রথমত, ব্যবসার পরিচালনার যত খাতে খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে, সেই সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে লোকসান কমিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, পণ্যের দাম কিছুটা বাড়িয়ে হলেও ব্যবসার লোকসান কমানো। কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়ানোর পথে এখনই তাঁরা যেতে চান না। আগে তাঁরা চান নানা খাতের খরচ কমিয়ে প্রথমত লোকসান যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। এরপর অন্য কোনো উপায় না থাকলে বা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সে ক্ষেত্রে পণ্যের দাম কিছুটা সমন্বয় করা হবে।
শুরুতেই সিঙ্গার বাংলাদেশ পণ্যের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে নারাজ। কারণ, কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পণ্যের দাম বাড়লে তাতে বিক্রির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, মানুষ তখন পণ্য কেনা কমিয়ে দেবেন। বিক্রি কমে গেলে তখন দাম বাড়িয়েও সুফল পাওয়া যাবে না। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে মানুষ আর্থিক চাপে রয়েছেন। এ অবস্থায় ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম বাড়ানো হলে মানুষ এই খাতে খরচ আরও কমিয়ে দেবেন বলে আশঙ্কা থেকে দাম বাড়ানোর পথে এখনই বেছে নিতে চায় না সিঙ্গার বাংলাদেশ।
* গত বছরের তুলনায় এ বছর উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৫ কোটি টাকার বেশি। * সুদ বাবদ খরচ বেড়েছে এক বছরের ব্যবধানে ২৩ কোটি টাকার বেশি। * পণ্য বিক্রির আয় বেড়েছে ১৯ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে কোম্পানিটির বিপণন বিভাগের পরিচালক জোবাইদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘উৎপাদন খরচ ও ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত আমাদের লোকসান বেড়েছে। এ কারণে পণ্য বিক্রির পরও লোকসান হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা লোকসান কমাতে সব খাতে খরচ কমানোর চেষ্টা করছি। এখনই পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর লোকসানের দায় চাপাতে চাই না আমরা। যদিও সিঙ্গারসহ ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সব প্রতিষ্ঠানই বাড়তি উৎপাদনের খরচের কারণে আর্থিকভাবে চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় পণ্যের দাম সমন্বয়ের কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে পুরো খাতে। তবে আমরা সেই পথে যাওয়ার আগে খরচ কমানোর সব চেষ্টার করব। এরপরই হয়তো কিছুটা দাম সমন্বয় করা হতে পারে।’
সিঙ্গারের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির খরচ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে ব্যাংক সুদসহ আর্থিক অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এই খাতে কোম্পানিটিকে ব্যয় করতে হয়েছে সোয়া ৭২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৪৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সুদ বাবদ খরচ বেড়েছে প্রায় পৌনে ২৩ কোটি টাকা। একইভাবে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৫ কোটি টাকার বেশি। গত বছরের প্রথম তিন মাসে সিঙ্গারের পণ্য উৎপাদন খরচের পরিমাণ ছিল ৪২৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৩ কোটি টাকায়। অথচ একই সময়ের ব্যবধানে কোম্পানির বিক্রি বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সিঙ্গার পণ্য বিক্রি করেছে ৫৭৭ কোটি টাকার। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৫৫৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রি বাবদ আয় বেড়েছে ১৯ কোটি টাকার। তারপরও বড় অঙ্কের লোকসান করতে হয়ে কোম্পানিটিকে।
খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিঙ্গারের মতো ইলেকট্রনিক পণ্য খাতের কোম্পানির লোকসানের জন্য যতটা না অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনগত দায়, তার চেয়ে বেশি প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। দেশের ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যার প্রভাবে হয় ব্যবসা কমছে, নয়তো লোকসান বাড়ছে।