করোনার পর শেয়ারবাজারে সূচকের বড় পতন মধ্যপ্রাচ্য সংকটে
করোনার পর দেশের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ‘পেনিক সেল বা আতঙ্কিত বিক্রির’ ঘটনা ঘটেছে আজ রোববার। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে আজ এক দিনেই প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ২৩১ পয়েন্ট বা প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ। তাতে ঢাকার বাজারের প্রধান সূচকটি আবারও নেমে এসেছে ৫ হাজার পয়েন্টের ঘরে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে এর আগে আজকের চেয়ে সূচকের বেশি পতন হয়েছিল ২০২০ সালের ৯ মার্চ। ওই দিন ডিএসইএক্স সূচকটি ২৭৯ পয়েন্ট বা সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি কমেছিল। এ পতনের আগের দিন, অর্থাৎ ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। সেই খবরে পরদিন শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়েছিল। এরপর দেশে করোনার বিস্তার বাড়তে থাকলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো শেয়ারবাজারও ২৬ মার্চ থেকে শাটডাউন বা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাতে দুই মাসের বেশি বন্ধ ছিল শেয়ারবাজারের লেনদেন। এরপর শেয়ারবাজার চালু হলেও সূচকের এত বড় পতন আর দেখা যায়নি। এর মধ্যে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেও শেয়ারবাজার ধাক্কা খেয়েছিল, কিন্তু তা এতটা ব্যাপক ছিল না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে যৌথ হামলা চালায়। ওই হামলার পর গত ছয় কার্যদিবসে ঢাকার বাজারে প্রধান সূচকটির পতন হয়েছে ৫৯১ পয়েন্ট বা সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। এ সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার, অর্থাৎ শেয়ারের ব্যাপক দরপতনে গত ছয় কার্যদিবসে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ দর হারিয়েছে। এর মধ্যে আজ এক দিনেই বাজার মূলধন কমেছে ১৩ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকার। সাম্প্রতিক সময়ে এক দিনে বাজার মূলধনের সর্বোচ্চ পতন।
বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ কারণে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা আরোপ করেছে সরকার। দেশের পেট্রলপাম্পগুলোতে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন লোকজন। এমন এক পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আতঙ্ক ভর করেছে। সেই আতঙ্কে গতকাল দিনের শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ শেয়ার বিক্রি শুরু করে। বাজারে ক্রেতা থাকলেও বিক্রির এ চাপ সামাল দিতে পারেননি তাঁরা; বরং ক্রেতারাও কিছুটা ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছেন। এ কারণে দিনের শুরুর পতন আর থামেনি। ভালো মানের শেয়ারের দামের বড় পতন সূচকের পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। তবে এ সময়ে বিনিয়োগকারীদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা। কারণ, যুদ্ধ চিরস্থায়ী নয়। যুদ্ধ থেমে গেলে বাজার আবার গতি ফিরে পাবে।মিনহাজ মান্নান, পরিচালক, ডিএসই
ঢাকার বাজারে আজ লেনদেন হওয়া ৩৯০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৭১টিরই বা ৯৫ শতাংশ দর হারিয়েছে। দাম বেড়েছে ১০টির বা আড়াই শতাংশের আর অপরিবর্তিত ছিল ৯টির বা প্রায় আড়াই শতাংশের। বাজারে দরপতন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার কোম্পানি ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। এ কারণে ঢাকার বাজারে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকাটিও ছিল অসম্পূর্ণ। এই তালিকায় ছিল মাত্র তিনটি কোম্পানি।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজকের সূচকের পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল ব্র্যাক ব্যাংকের। এদিন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বা সাড়ে ৬ টাকা কমে নেমে এসেছে ৭১ টাকায়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল সাড়ে ৮৭ টাকা। সেই হিসাবে মাত্র ছয় কার্যদিবসে ব্যাংকটির শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় ১৭ টাকা বা ১৯ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে আজ ব্যাংকটির শেয়ারের সাড়ে ৮ শতাংশ দরপতনে ডিএসইএক্স সূচকটি কমেছে ২৭ পয়েন্ট। ব্র্যাক ব্যাংক ছাড়াও এদিন ডিএসইএক্স পতনে আরও যেসব কোম্পানির শেয়ারের দরপতন বড় ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে ছিল ইসলামী ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মা, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি), পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ। উল্লেখিত এই ৯ কোম্পানির শেয়ারের দরপতনে ডিএসইএক্স সূচকটি কমেছে সম্মিলিতভাবে ৮৬ পয়েন্টের বেশি, অর্থাৎ ১০ কোম্পানির শেয়ারের দরপতনেই ডিএসইএক্স সূচকটি কমেছে ১১৩ পয়েন্টের বেশি।
বাজারের এ পতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কী করছে—বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এটিও এখন বড় প্রশ্ন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পতন ঠেকাতে কাউকে শেয়ার কেনার অনুরোধ করার পুরোনো এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কাউকে শেয়ার কিনতে বলা বা বিক্রি না করতে বলা—এ ধরনের কোনো উদ্যোগ আমাদের নেই। তবে কেউ বাজারে ইচ্ছাকৃতভাবে বা কারসাজির মাধ্যমে দরপতন ঘটাচ্ছে কি না, সেটি আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বাজারে তদারকি জোরদার করেছি।’
এদিকে বড় দরপতন হলেও এদিন বাজারে লেনদেন আগের দিনের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। ঢাকার বাজারে আজ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৩২ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ৭৩ কোটি টাকা বেশি। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির তালিকায় ছিল যথাক্রমে সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন, স্কয়ার ফার্মা ও রবি আজিয়াটা। এই পাঁচ কোম্পানির সম্মিলিত লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা, যা বাজারের মোট লেনদেনের সোয়া ২০ শতাংশ।
বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ভাগ্যও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের যেন কোনোভাবেই সহায়তা করছে না। নতুন সরকারের অধীন বাজারে যখন বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্য সংকট বাজারকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। তবে এ সময়ে বিনিয়োগকারীদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা। কারণ, যুদ্ধ চিরস্থায়ী নয়। যুদ্ধ থেমে গেলে বাজার আবার গতি ফিরে পাবে।