বড় উত্থানে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন ডিএসইতে

সূচকের বড় উত্থানে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আবারও সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে লেনদেনও ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে আজ রোববার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯৩ পয়েন্ট বা পৌনে ২ শতাংশ বেড়েছে। তাতে দিন শেষে সূচকটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩৬ পয়েন্ট। গত ১০ মাসের মধ্যে এটি ডিএসইএক্সের সর্বোচ্চ অবস্থান। এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ১ অক্টোবর ডিএসইএক্স সূচকটি ৫ হাজার ৫৮৬ পয়েন্ট ছিল। এরপর আজকের বড় উত্থানে সেটি আবারও সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক ছাড়িয়েছে।

প্রায় এক মাস ধরে শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে। এই সময়ে ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত অবস্থায় ছিল। এখন ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়তে থাকায় সূচকও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি লেনদেনও হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এটিকে বাজারের জন্য ইতিবাচক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, ভালো কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে লেনদেন এবং সূচক বাড়লে তাতে সেটি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আবার ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঝুঁকিও কমে আসে।

শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে আজ রোববার সূচকের বড় উত্থানের পেছনে যে ১০টি কোম্পানির সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল, সেগুলো হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, পূবালী ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, বিএসআরএম লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), লাফার্জহোলসিম, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, অলিম্পিক ইন্ড্রাস্টিজ ও গ্রামীণফোন। এই ১০ কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতে আজ ডিএসইএক্স সূচকটি ৫২ পয়েন্টের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতেই ডিএসইএক্স সূচকটি বেড়েছে ১৫ পয়েন্টের বেশি। এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইএক্স সূচকটি বেড়েছে ৬ পয়েন্টের মতো। এদিন ঢাকার বাজারে বেক্সিমকো ফার্মার প্রতিটি শেয়ারের দাম ৫ টাকা ২০ পয়সা বা সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৮ টাকা ৪০ পয়সায়।

ব্যাংক খাতে আমানত ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদের ঊর্ধ্বমুখী যে ধারা ছিল, সেটিও এখন কিছুটা স্থিতিশীল। নতুন করে সুদের হার না বেড়ে বরং কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এ কারণে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আবারও শেয়ারবাজারমুখী হয়েছে।
শাকিল রিজভী, পরিচালক, ডিএসই।  

এ ছাড়া ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে আজ ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ২ টাকা ৬০ পয়সা বা পৌনে ৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৮ টাকা ৪০ পয়সা। গত এক মাসে ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রায় ১৫ টাকা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের এই উত্থানে বড় ভূমিকা রাখছে ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলোর মূল্যবৃদ্ধি। গত এক মাসে কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক অন্যতম।

ঢাকার বাজারে আজ ৩৬টি ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন হয়। এর মধ্যে ২৪টির শেয়ারের দাম বেড়েছে। দাম কমেছে ৫টির আর অপরিবর্তিত ছিল ৬টির দাম। ঢাকার বাজারে আজ লেনদেনের শীর্ষে ছিল উত্তরা ব্যাংক। এদিন ব্যাংকটির প্রায় সাড়ে ৪৪ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়। দিন শেষে উত্তরা ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ৯০ পয়সা বা ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ টাকা ৭০ পয়সায়।

লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকসহ ভালো মৌল ভিত্তির কিছু কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতে যেমন সূচকের বড় উত্থান হয়েছে, তেমনি কিছু ব্যাংক ও ভালো কোম্পানির শেয়ার সূচকের পতনেও বড় ভূমিকা রেখেছে আজ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট। গত কয়েক দিনে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বেশ খানিকটা বৃদ্ধির পর আজ কিছুটা কমেছে, যেটাকে মূল্য সংশোধন বলে মনে করেন বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেন, গত এক মাসে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের দাম ২০ টাকার বেশি বেড়েছে। তাই এখন বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এই শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেবেন এটাই স্বাভাবিক। এভাবে মূল্যবৃদ্ধির এক পর্যায়ে এসে আরও কিছু কোম্পানির শেয়ারের মূল্য সংশোধন হচ্ছে।

এদিকে ব্যাংকসহ ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণে বাজারে লেনদেনও বেড়েছে। আজ ঢাকার বাজারে লেনদেনের‌‌‌ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ৭৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। শুধু তা–ই নয়, গত প্রায় এক বছরের মধ্যে আজই ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ১৪ আগস্ট ঢাকার বাজারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল।

বাজারে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে গত বাজেটের সময় থেকেই সরকারের দিক থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আমানত ও ট্রেজারি বিল–বন্ডের সুদের ঊর্ধ্বমুখী যে ধারা ছিল, সেটিও এখন কিছুটা স্থিতিশীল। নতুন করে সুদের হার না বেড়ে বরং কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এ কারণে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আবারও শেয়ারবাজারমুখী হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের উত্থানে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো ভালো কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজার টেকসই ও স্থিতিশীল একটি রূপ পাবে। তবে ভালো শেয়ারের দামও যাতে অতি মূল্যায়িত না হয়ে যায় সে জন্য এখন উচিত বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো।