শেয়ারবাজার কখনো নিয়ন্ত্রিত বাজার বা কন্ট্রোলড মার্কেট হতে পারে না। বিএসইসি বাজারের পতন ঠেকাতে যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেগুলো অনেকটা নিয়ন্ত্রিত বাজারেরই নমুনা।
ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক চেয়ারম্যান, বিএসইসি

বিএসইসির নেতৃত্ব বদল ও ফ্লোর প্রাইসের কারণে শেয়ারবাজারে ধীরে ধীরে গতি ফিরতে শুরু করে। সেই কারণে গত বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ধাপে ধাপে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়। এরপর ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত বছরের ১০ অক্টোবর ৭ হাজার ৩৬৮ পয়েন্টের সর্বোচ্চ সীমায় উঠেছিল। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা শুরু করার পর শেয়ারবাজারে আবারও মন্দাভাব দেখা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে গত ঈদুল আজহার ছুটির পর একটানা দরপতন চলছে বাজারে।

গতকালও ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৫৭ পয়েন্ট বা প্রায় ১ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ৫ হাজার ৯৮০ পয়েন্টে। তাতেই পতন ঠেকাতে নতুন করে আবারও শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দামের সর্বনিম্ন সীমা বেঁধে দিল বিএসইসি। সংস্থাটি জানিয়েছে, করোনা-পরবর্তী ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ।

যেভাবে কার্যকর হবে ফ্লোর প্রাইস

বিএসইসি বলছে, গতকালসহ গত পাঁচ কার্যদিবসের দিনের সর্বশেষ বাজারমূল্য বা ক্লোজিং প্রাইসের গড় হবে শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বা ফ্লোর প্রাইস। বেঁধে দেওয়া ওই সীমার নিচে এখন থেকে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম নামতে পারবে না।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, গত পাঁচ কার্যদিবসে ‘এ’ কোম্পানির শেয়ারের দিন শেষের বাজারমূল্য ছিল যথাক্রমে ১০০, ৯০, ৮০, ৭০ ও ৬০ টাকা। এই পাঁচ দিনের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ‘এ’ কোম্পানির গড় মূল্য দাঁড়ায় ৮০ টাকা। নতুন বিধান অনুযায়ী, ৮০ টাকাকে ‘এ’ কোম্পানির সর্বনিম্ন মূল্য হিসেবে বেঁধে দেওয়া হবে রোববার থেকে।

তবে করপোরেট ঘোষণা বিশেষ করে লভ্যাংশ ঘোষণাসংক্রান্ত কারণে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে সেটি করা যাবে। আবার নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রথম কার্যদিবসের দিন শেষের বাজারমূল্য হবে ওই কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম।

এদিকে সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি শেয়ারের দরপতনের সর্বনিম্ন সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। শেয়ারের দাম কমার ক্ষেত্রে সীমা আরোপের কারণে এত দিন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম এক দিনে সর্বোচ্চ ২ শতাংশের বেশি কমতে পারত না। আগামী রোববার থেকে শেয়ারের দাম আগের মতো এক দিনে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়তে বা কমতে পারবে। তবে কোনোভাবেই তা নতুন করে বেঁধে দেওয়া দামের নিচে নামতে পারবে না।

বাজার পরিস্থিতি

গতকালের দরপতনের ফলে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ফিরে গেছে প্রায় সাড়ে ১৩ মাস আগের অবস্থানে। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। সাধারণত শেয়ারবাজারে সূচকের ৫ হাজার, ৬ হাজার, ৭ হাজার পয়েন্টের অবস্থানকে মনস্তাত্ত্বিক সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সূচক এসব সীমা অতিক্রম করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেমন খুশি হন, ঠিক একইভাবে এসব সীমার নিচে নামতে থাকলে আতঙ্কও ভর করে তাঁদের মনে। গতকাল লেনদেনের ক্ষেত্রে এ আতঙ্কের প্রভাব দেখা গেছে। ঢাকার বাজারে গতকাল দিন শেষে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪২ কোটি টাকায়, যা আগের দিনের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বা ৩৩৬ কোটি টাকা কম। অর্থাৎ সূচক মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় লেনদেনও প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীরা এখন খুব বেশি সক্রিয় নন বাজারে। আবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভর করেছে আতঙ্ক। তাই অনেকে কিছু পুঁজি বাঁচাতে লোকসানেও শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার টানা দরপতনে শেয়ারের দাম অনেক কমে যাওয়ায় ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ জোরপূর্বক বিক্রি বা ফোর্সড সেলের আওতায় পড়েছেন। এতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিক থেকে বেড়েছে বিক্রির চাপ। সব মিলিয়ে বাজারে এখন ক্রেতা কম, বিক্রেতা বেশি।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘শেয়ারবাজার কখনো নিয়ন্ত্রিত বাজার বা কন্ট্রোলড মার্কেট হতে পারে না। বিএসইসি বাজারের পতন ঠেকাতে যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেগুলো অনেকটা নিয়ন্ত্রিত বাজারেরই নমুনা। দীর্ঘ মেয়াদে এসব পদক্ষেপ শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর আগে আমরা দেখেছি, দাম কমার ক্ষেত্রে ২ শতাংশ সীমা আরোপ করায় লেনদেন কমে গিয়েছিল। এখন শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়ার কারণেও লেনদেন কমে যেতে পারে। সাময়িক বা কয়েক সপ্তাহের জন্য এ সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়, তাহলে কিছু বলার নেই। যদি এ ধরনের ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি রেখে দেওয়া হয়, তাহলে তা বাজারের জন্য কখনোই মঙ্গলজনক হবে না।

শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন