৬৯৪ কোটি টাকা মুনাফা বেক্সিমকোর, লভ্যাংশ দেবে ২১২ কোটি টাকার
গত বছরের জুনে সমাপ্ত আর্থিক বছরে ৬৯৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। শেয়ারবাজারে যেটি বেক্সিমকো ফার্মা নামে বেশি পরিচিত। গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় গত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। তাতে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার এই হিসাব পাওয়া গেছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সম্মতিতে গতকাল এই পর্ষদ সভা করে কোম্পানিটি। ওই সভায় গত বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সমাপ্ত বিভিন্ন প্রান্তিকের পাশাপাশি সর্বশেষ গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করা হয়। গত অর্থবছরে ৬৯৪ কোটি টাকা মুনাফার পর কোম্পানিটি ওই বছরের জন্য শেয়ারধারীদের সাড়ে ৪৭ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সভায়। তাতে গত অর্থবছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারধারীরা প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ৪ টাকা ৭৫ পয়সা লভ্যাংশ পাবেন।
ঘোষিত লভ্যাংশ অনুযায়ী, শেয়ারধারীদের মধ্যে গত অর্থবছরের জন্য কোম্পানিটি লভ্যাংশ বাবদ ২১২ কোটি টাকা বিতরণ করবে। আদালতের অনুমোদনক্রমে বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) তারিখ নির্ধারণের পর ওই সভা শেষে ঘোষিত এই লভ্যাংশ বিতরণ করা হবে। এ জন্য রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২ আগস্ট। ওই দিন যাঁদের হাতে কোম্পানিটির শেয়ার থাকবে তাঁরা ঘোষিত এই লভ্যাংশ পাবেন।
কোম্পানিটি গত অর্থবছরের জন্য যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে তার মধ্যে ৬৪ কোটি টাকা পাবেন কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকেরা। কারণ তাঁদের হাতে রয়েছে কোম্পানির ৩০ শতাংশের বেশি শেয়ার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৮ কোটি টাকা লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন কোম্পানিটির শেয়ারের বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির ২৭ শতাংশের বেশি শেয়ার। আর সাড়ে ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। তার বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ বাবদ পাবেন ৫৪ কোটি টাকা। আর ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পাবেন ৩৬ কোটি টাকার লভ্যাংশ। কারণ তাঁদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির ১৭ শতাংশের বেশি শেয়ার।
বেক্সিমকো ফার্মার মালিকানায় রয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও তাঁর পরিবার। গণ–আন্দোলনে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে সালমান এফ রহমান। ক্ষমতার পালাবদলের পর ২০২৫ সালের শুরুতে বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালনা পর্ষদে ৯ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয় বিএসইসি। বিএসইসির সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে কোম্পানিটি। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় গত প্রায় দেড় বছর কোনো পর্ষদ সভা করেনি বেক্সিমকো ফার্মা। ফলে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের কোনো তথ্যও পাচ্ছিলেন না বিনিয়োগকারীরা।
বেক্সিমকো ফার্মা দেশের শেয়ারবাজারের পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটেও (এআইএম) তালিকাভুক্ত। আইএম মার্কেটের নিয়মানুসারে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের বাধ্যতাবাধকতা ছিল। কিন্তু স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে আদালতে আইনি লড়াইয়ের কারণে কোম্পানিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এ অবস্থায় গত ২ জানুয়ারি থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
এআইএমের বিধান অনুযায়ী, টানা ছয় মাস কোনো কোম্পানির লেনদেন স্থগিত থাকলে সেটিকে তালিকাচ্যুত করার নিয়ম। এ অবস্থায় আগামী জুলাই থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে কোম্পানিটির তালিকাচ্যুত হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। যার জন্য লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বেক্সিমকোর শেয়ারের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিএসইসিকে চিঠি দেয়। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি বেক্সিমকো ফার্মাকে পর্ষদ সভা করে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সম্মতি দেয়। তারই ভিত্তিতে গতকাল পর্ষদ সভা করে কোম্পানিটি।
এদিকে গত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণা ও বেশ কিছু প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরও আজ বুধবার ঢাকার শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দরপতন হয়েছে। এদিন বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত ডিএসইতে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৩ টাকা ৬০ পয়সা বা প্রায় আড়াই শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪২ টাকায়। শেয়ারের দাম কমলেও এদিন লেনদেনের শীর্ষে রয়েছে কোম্পানিটি। বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত কোম্পানিটির ৪৪ কোটি টাকার সমমূল্যের শেয়ারের হাতবদল হয়েছে।