শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ আয়ে কর সুবিধা পাবেন ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা

—ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার কমিয়ে ১৫% করা হয়েছে।

— মিউচুয়াল ফান্ডে কর রেয়াত সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা প্রত্যাহার।

সংশোধিত অর্থ বিলে এবার শেয়ারবাজারের জন্য একগুচ্ছ প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ৯ জুন ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য খুব বেশি প্রণোদনা ছিল না। অবশেষে একগুচ্ছ প্রণোদনার ঘোষণা শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নতুন করে আশাবাদী করেছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন প্রণোদনা ঘোষণায় বেশি সুবিধা মিলবে লভ্যাংশ আয়ে। পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও তা সহায়ক হবে। সেই সঙ্গে নতুন কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী করে তুলবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে আজ সোমবার অর্থ বিল সংশোধনের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার কথা বলেছেন। এই সিদ্ধান্ত ভালো কোম্পানিতে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ে করহারের যে নতুন বিধান করা হয়েছে, তাতে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ভালো সুফল পাবেন। একইভাবে কোম্পানি করদাতারাও অন্য কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে আগের সুবিধা পাবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারকে গতিশীল করতে সহায়তা করবে।
—মাসুদ খান, চেয়ারম্যান, বিএসইসি

উদাহরণ দিয়ে বলা যাক, কোনো একজন বিনিয়োগকারী একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বছর শেষে এক লাখ টাকা লভ্যাংশ পেয়েছেন। ওই বিনিয়োগকারী ব্যক্তিগতভাবে ২৫ শতাংশ করহারের স্তরের একজন করদাতা। বর্তমান বিধানে ওই করদাতা বিনিয়োগকারী যখন এক লাখ টাকা লভ্যাংশ আয় পান তখন লভ্যাংশ বিতরণকারী কোম্পানি শুরুতেই ১০ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখে। এতে ওই বিনিয়োগকারী লভ্যাংশ বাবদ পান ৯০ হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিলের সময় যখন ওই আয় যুক্ত হয় তখন ওই করদাতাকে সেই আয়ের বিপরীতে আরও ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। কারণ, ওই বিনিয়োগকারী ২৫ শতাংশ করস্তরের একজন করদাতা। তাই লভ্যাংশ থেকে অগ্রিম কেটে নেওয়া ১০ শতাংশের বাইরে করস্তরের বাকি ১৫ শতাংশ কর তাঁকে রিটার্ন দাখিলের সময় পরিশোধ করতে হতো। এতে শেষ পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার দাঁড়াত ব্যক্তি করদাতার করহারের সমান। এখন সেই বিধান বাতিল করে নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে লভ্যাংশ বিতরণের সময়ই সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ১৫ শতাংশ হারে কর কেটে রেখে বাকি টাকা লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করবে। আর বিনিয়োগকারী যখন রিটার্নে এই লভ্যাংশ আয় হিসেবে দেখাবেন তখন তাঁকে আর বাড়তি কোনো কর দিতে হবে না।

শেয়ারবাজারের ব্যক্তিশ্রেণির মাঝারি ও বড় বিনিয়োগকারীরা বলছেন, নতুন এই প্রণোদনার ফলে এখন তাঁরা ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হবেন। আগে বেশি করহারের কারণে লভ্যাংশ ঘোষণার পরও অনেকে রেকর্ড তারিখের আগে শেয়ার বিক্রি করে দিতেন। কারণ, নগদ লভ্যাংশ পেলে তার জন্য বেশি হারে কর দিতে হতো। এখন সেটি হবে না। বরং যেসব কোম্পানি ভালো নগদ লভ্যাংশ দেয় সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ বাড়বে।

একইভাবে কোম্পানি করদাতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধান করা হয়েছে। একটি কোম্পানি আরেক কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে যে লভ্যাংশ আয় করবে তার জন্য ২০ শতাংশ হারে করহারকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। লভ্যাংশ বিতরণকারী কোম্পানি লভ্যাংশ বিতরণের সময়ই এই কর কেটে রাখবে। আগেও এই বিধান ছিল। তবে ৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেটে বিধানটি সংশোধন করে কোম্পানি করদাতার ক্ষেত্রে লভ্যাংশ আয়কে কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য করহারে যুক্ত করা হয়। শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আপত্তির কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের এই বিধানটি বাদ দিয়ে আগের মতো ২০ শতাংশ কর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করার বিধান ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

জানা গেছে, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিলে এসব সংশোধন আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজেট প্রস্তাবের পর শেয়ারবাজারের স্বার্থে আমরা কিছু প্রণোদনার জন্য সরকার ও এনবিআরের কাছে দাবি জানিয়েছিলাম। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেসব বিষয় অর্থ বিলের সংশোধনীতে যুক্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ে করহারের যে নতুন বিধান করা হয়েছে তাতে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ভালো সুফল পাবেন। একইভাবে কোম্পানি করদাতারাও অন্য কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে আগের সুবিধা পাবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারকে গতিশীল করতে সহায়তা করবে।’

এ ছাড়া অর্থ বিলের সংশোধনীতে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমাও তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে বলেও মনে করছেন শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বর্তমানে শেয়ারবাজারে কোম্পানির শেয়ারের যেকোনো অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে কর রেয়াত সুবিধা নেওয়া যায়; কিন্তু মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে সেই সীমা ছিল পাঁচ লাখ টাকা। এখন সেই সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে করদাতারা যেভাবে শেয়ারে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত সুবিধা পান, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেও একই ধরনের সুবিধা পাবেন।