শেয়ারবাজারের অর্ধেকের বেশি মিউচুয়াল ফান্ডের ভাগ্য নির্ধারিত হবে জুনের মধ্যে

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ভবনসংগৃহীত

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তালিকাভুক্ত যেসব মিউচুয়াল ফান্ডের প্রকৃত সম্পদমূল্য বা এনএভির চেয়ে বাজারমূল্য ন্যূনতম ২৫ শতাংশ কম, সেসব মিউচুয়াল ফান্ড হয় অবসায়িত হবে, নয়তো রূপান্তরিত হবে বে-মেয়াদি তহবিলে। এই দুইয়ের মধ্যে ফান্ডগুলোর পরিণতি কোনটি হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন এসব ফান্ডের ইউনিটধারীরা।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) গত বছর সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার পরিপালনের আওতায় বড় এই পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার এই বিধিমালার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াসংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে বিএসইসি। মিউচুয়াল ফান্ডের সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ১২ মে তারিখ পর্যন্ত যেসব ফান্ডের ইউনিটের বাজারমূল্য ওই ফান্ডের এনএভির চেয়ে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ কম, সেসব ফান্ডকে ১২ জুনের মধ্যে বে-বেয়াদিতে রূপান্তর বা অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।

বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, যেসব মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্য ওই ফান্ডের এনএভির চেয়ে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ কম রয়েছে, সেসব ফান্ডের ট্রাস্টি বোর্ডকে আগামী ১২ জুনের মধ্যে ট্রাস্টি সভার মাধ্যমে ইউনিটগুলোর রেকর্ড তারিখ ঘোষণা করতে হবে। ওই রেকর্ড তারিখ থেকে বাজারে ফান্ডগুলোর লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর ইউনিটধারীদের বিশেষ সভায় ফান্ডগুলোর রূপান্তর বা অবসায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ সভায় ইউনিটধারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফান্ডের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।

বিএসইসি বলছে, মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটধারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেসব ফান্ড এনএভির চেয়ে অনেক কম দামে বাজারে লেনদেন হচ্ছে, সেগুলোর ইউনিটধারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফান্ডগুলো অবসায়িত বা বে-মেয়াদি তহবিলে রূপান্তর—যেটিই হোক না কেন, তাতে ইউনিটধারীরা লাভবান হবেন। তাই এ সিদ্ধান্তে ইউনিটধারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

জানা যায়, দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ফান্ড বে-মেয়াদে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বাকি ৩৪টি ফান্ডের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বর্তমানে এনএভির চেয়ে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ কম দামে বাজারে লেনদেন হচ্ছে। বিএসইসির বিধিমালা অনুযায়ী, এখন এসব ফান্ডের বিষয়ে অবসায়ন বা বে-মেয়াদিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, তালিকাভুক্ত কোনো একটি মিউচুয়াল ফান্ডের এনএভি ১০ টাকা। আর সেটির প্রতিটি ইউনিটের বাজারমূল্য ৭ টাকা। তাহলে ওই ফান্ডের ট্রাস্টি বোর্ডকে আগামী ১২ জুনের মধ্যে ফান্ডের পরিণতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রেকর্ড তারিখ ঘোষণা করতে হবে। তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের কোনটির বাজারমূল্য এনএভির নির্ধারিত সীমার কম, সেটি নির্ধারিত হবে ১২ মে তারিখের আগের ছয় মাসের গড় বাজারমূল্যের ভিত্তিতে। ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি বা ট্রাস্টি বোর্ড এই গড় দাম নির্ধারণ করবে।

* মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, ১২ জুনের মধ্যে বে-মেয়াদিতে রূপান্তর বা অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিতে হবে।
* ফান্ডগুলোর রূপান্তর বা অবসায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইউনিটধারীদের মতামতের ভিত্তিতে।

জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্য এনএভির চেয়ে অনেক কম। তাতে এসব ফান্ডের ইউনিটধারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেশি এনএভির ইউনিট কম দামে তাঁদের বাজারে কেনাবেচা করতে হচ্ছে। এখন যদি এসব ফান্ড বে-মেয়াদিতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে ইউনিটধারীরা এনএভির কাছাকাছি দামে ইউনিট বিক্রির সুযোগ পাবেন। আবার ইউনিটধারীরা যদি তহবিল অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেন, তাতেও তাঁরা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম পাবেন। ফলে শেষ বিচারে ইউনিটধারীরা তাতে লাভবান হবেন।

বিএসইসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এনএভির চেয়ে কম দামে লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ মিউচুয়াল ফান্ড যদি বে-মেয়াদি তহবিলে রূপান্তরিত হয়, তাতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ, তাতে ফান্ডের শেয়ার বিক্রি করতে হবে না। আবার ইউনিটধারীরাও তাতে লাভবান হবেন। কারণ, বে-মেয়াদে রূপান্তরের পর তাঁরা এনএভির দামে চাইলে ইউনিট বিক্রি করে বিনিয়োগ তুলে নিতে পারবেন। মিউচুয়াল ফান্ডের সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, বে-মেয়াদি তহবিলের ক্ষেত্রে কোনো ইউনিটধারী তাঁর হাতে থাকা ইউনিট বিক্রি করতে চাইলে তিন দিনের মধ্যে ওই লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ছাড়া বিশেষ সভায় ইউনিটধারীরা চাইলে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানও পরিবর্তন করতে পারবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী জানান, যদি ইউনিটধারীদের মতামতের ভিত্তিতে ফান্ডের পরবর্তী ভাগ্য নির্ধারিত হয়, তবে সেটিই ভালো সিদ্ধান্ত হবে। তবে ইউনিটধারীদের মতামতকে যাতে কোনোভাবে প্রভাবিত করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এরই মধ্যে যেসব তহবিলের মেয়াদ ১০ বছর পেরিয়ে গেছে, সেগুলোর অবসায়ন বা বে-মেয়াদি তহবিলে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত ইউনিটধারীদের মতামতের ভিত্তিতে হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

শেয়ারবাজারে দুই ধরনের মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে। একটি মেয়াদি, এসব ফান্ড শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। শেয়ারবাজারের মাধ্যমে এসব ফান্ড কেনাবেচার সুযোগ পান বিনিয়োগকারীরা। নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদি ফান্ডের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে তহবিলটি অবসায়ন হবে। তবে অতীতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা নানা চাপে মেয়াদি ফান্ডের মেয়াদও বাড়িয়ে দিয়েছে। বে-মেয়াদি ফান্ড শেয়ারবাজারের বাইরে সম্পদ ব্যবস্থাপক নিযুক্ত এজেন্টের মাধ্যমে কেনাবেচা হয়। বে-মেয়াদি ফান্ডের ইউনিট সাধারণত এনএভির কাছাকাছি দামে কেনাবেচা হয়। আর মেয়াদি ফান্ড লেনদেন হয় বাজারমূল্যে।