তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘আমাদের বাজার যতটা না অর্থনৈতিক কারণে আক্রান্ত, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও ভয়ের প্রভাব। গত কয়েক দিনে সরকার সংকট মোকাবিলায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে মানুষের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ভর করেছে। যার প্রভাব এসে শেয়ারবাজারেও লাগছে।’

শেয়ারবাজারে কেন এ দরপতন তা জানতে গত কয়েক দিনে অন্তত আটটি ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের বেশির ভাগই জানিয়েছেন, বাজারে এখন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। একটি অংশ টানা পতনে লোকসানে পড়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। আরেকটি অংশ সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে চুপচাপ বসে আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষস্থানীয় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান জানান, শেয়ারবাজারে তাঁদের ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগসীমা ও বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ করা তহবিল রয়েছে। গত বছর সেই তহবিলের পুরোটা বাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এরপর মুনাফাসহ বড় একটি অংশই তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তাঁদের ৫০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ আছে। বাকি অর্থ ব্যাংকে স্থায়ী আমানত ও জিরো কুপন বন্ডে বিনিয়োগ করে রাখা হয়েছে। এ দুই খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে সুদ মিলছে। কিন্তু শেয়ারবাজারে এ অর্থ বিনিয়োগ করলে তাতে লোকসানের বড় ঝুঁকি রয়েছে।

কেন শেয়ারবাজারের প্রতিষ্ঠান হয়েও বাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও দেশের অর্থনীতির যে সংকট তৈরি হয়েছে, শেয়ারবাজার তার বাইরে থাকবে না। এ অবস্থায় বাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা তুলে নেওয়া খুব কঠিন। এ কারণে তহবিল ঝুঁকি কমাতে কিছু অর্থ নিরাপদ বিনিয়োগ পণ্যে খাটানো হয়েছে।

মার্চেন্ট ব্যাংকের ওই শীর্ষ নির্বাহীর ওই বক্তব্যের কিছু সত্যতা পাওয়া যায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন থেকে। গতকাল বুধবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ তাদের অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০২২) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোম্পানিটির মুনাফা আগের বছরের চেয়ে অর্ধেক কমে গেছে। আর মুনাফা কমে যাওয়ার জন্য কোম্পানিটি যে কটি কারণের কথা জানিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, দেশে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি। কোম্পানিটি এ–ও বলছে, গত কয়েক মাসে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে ক্রেতারা ইলেকট্রনিক পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। সিঙ্গার বাংলাদেশ ফ্রিজ, এসি, টেলিভিশনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক সামগ্রী উৎপাদন ও বাজারজাত করে থাকে।

কোম্পানিটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আকরাম উদ্দিন আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাঁচামাল ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আগের বছরের চেয়ে আমাদের পণ্য উৎপাদন ও বিপণন খরচ ১৪ শতাংশ বেড়েছে। খরচের এই চাপ সামাল দিতে আমরা পণ্যমূল্য ৯ শতাংশের মতো বাড়িয়েছি। তারপরও মুনাফা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে।’

কোম্পানির মুনাফার সঙ্গে শেয়ারের দামের সম্পর্ক রয়েছে। মুনাফা কমে যাওয়া মানে শেয়ারের দামও কমে যাওয়া। যেমন সিঙ্গারের মুনাফা কমায় গতকাল বাজারে এটির শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে গেছে। এ কারণে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন, আগামী দিনে অন্যান্য কোম্পানির মুনাফা কমে যাওয়ায় তথ্য আসা শুরু করলে সেগুলোর দামের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর না হলে বাজার পুরোপুরি ছন্দ ফিরে পাবে না বলেই মনে করে বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ। এ কারণে তারা বাজারে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

শেয়ার বিক্রির চাপ

ঈদুল আজহার ছুটির পর গত সাত কার্যদিবসে একটানা দরপতনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২২৮ পয়েন্ট কমেছে। তাতে ডিএসইএক্স সূচকটি নেমে এসেছে ৬ হাজার ১৩৯ পয়েন্টে। আর ছয় কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন ১২৪ কোটি টাকা কমে নেমে এসেছে ৬৬৫ কোটি টাকায়। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টানা পতনের কারণে ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অনেকের শেয়ার জোরপূর্বক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের ঋণ সমন্বয়ের তাগাদা দিয়ে চিঠি দিয়েছে। ঋণ সমন্বয় করা না হলে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও বা পত্রকোষে থাকা শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করা হবে বলেও প্রতিষ্ঠানগুলো চিঠিতে জানিয়েছে।

শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড বা সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির পর টানা পতনের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার বিনিয়োগকারী তাঁদের সব শেয়ার বিক্রি করে বিও হিসাব খালি করেছেন। ১২ জুলাই শেয়ার আছে এমন বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৫১। গতকাল লেনদেন শেষে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৩০৬।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএসইসির সাক্ষাৎ

গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত–উল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে অনুদানের পাঁচ কোটি টাকা দিতেই মূলত এ সাক্ষাৎ। তবে এ সময় শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান। বিএসইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাক্ষাৎকালে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী বিএসইসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাজারে যাতে অহেতুক দরপতন বা ভীতির সঞ্চার না হয়, সে জন্য বিএসইসির তদারকি জোরদার করারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

রেজাউল করিম বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা বাজারে তদারকি বাড়িয়েছি। বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলছি। বাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বিএসইসির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

বিশ্লেষকেরা যা বলছেন

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকার সাম্প্রতিক সময়ে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও একধরনের ভীতির সঞ্চার হয়েছে। এ ভয় থেকেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তবে বৈশ্বিক ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শেয়ারবাজার খুব বেশি চাঙা হয়ে যাবে—এমনটা আমি মনে করি না। পাশাপাশি টানা দরপতন হওয়ারও যৌক্তিক কোনো কারণ দেখি না। যেহেতু আমাদের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কম, তাই সেদিক থেকে অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত। আবার বর্তমানে শেয়ারের দামও বেশ নিচে রয়েছে। এ অবস্থায় বাজারে টানা দরপতনের যৌক্তিক কোনো কারণ দেখি না।’

শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন