ডিএসই–শীর্ষ ব্রোকারদের বৈঠক
দিনে দিনে শেয়ার কেনাবেচা সুবিধা ডিসেম্বরে
- তদন্তের উদ্যোগে যাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি না ছড়ায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ।
- মন্দা বাজারে গতিশীলতা ফেরাতে শর্টসেল চালুর দাবি।
– মিউচুয়াল ফান্ড খাতে গতি ফেরানোর তাগিদ।
শেয়ারবাজারে ডে নেটিং বা দিনে দিনে শেয়ার কেনাবেচার সুবিধা চালু হবে ডিসেম্বরের মধ্যে। এই সুবিধা চালু হলে বিনিয়োগকারীরা একই দিনে একই শেয়ার যতবার খুশি ততবার কেনাবেচা করতে পারবেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেয়ারবাজারে এই সুবিধা চালু করা হবে বলে জানিয়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ।
শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে করণীয় বিষয়ে ডিএসইর সদস্যভুক্ত শীর্ষ ৩০ ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার এক বৈঠকে এই তথ্য জানিয়েছে ডিএসই। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া বৈঠকে স্থগিত বিও হিসাবের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে গতি ফেরানোসহ বাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
গত জুলাইয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ডে নেটিং সুবিধা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে। বিএসইসির সিদ্ধান্তের পর ডে নেটিং সুবিধা চালুর বিষয়ে কাজ শুরু করে ডিএসই। আজকের সভায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের মধ্যে এই সুবিধা চালুর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
শীর্ষ ৩০ ব্রোকারেজ হাউসের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীরা বিভিন্ন ধরনের তদন্তের নামে বাজারে যাতে ভীতি ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য ডিএসইর প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও ব্রোকারেজ হাউসে তদন্তের উদ্যোগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীদের এই অভিযোগের জবাবে ডিএসইর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার স্বার্থে তদন্ত জরুরি। ডিএসইর কাজের একটি বড় অংশজুড়েই আছে নানা অনিয়মের তদন্ত। ব্রোকারেজ হাউসের প্রতিনিধিরা তদন্তের বিষয়ে একমত পোষণ করেন। তবে তাঁরা বলেন, তদন্ত এমনভাবে করতে হবে, যাতে তা বাজারে সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি না ছড়ায়। দফায় দফায় তদন্তের চিঠি দিয়ে তথ্য সংগ্রহের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহী অভিযোগ করেছেন, কয়েক বছর আগের ঘটনায়ও এখন এসে তদন্ত করা হচ্ছে। আবার একই বিষয়ে বারবার তথ্য চাওয়া হচ্ছে। ব্রোকারেজ হাউসের সেই তথ্য যাচাই–বাছাই ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। যার ফলে প্রকৃত তথ্য তাতে পাওয়া যায় না। উল্টো ভোগান্তিতে পড়তে হয় ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে। এ কারণে বৈঠকে উপস্থিত ব্রোকারেজ হাউস প্রতিনিধিরা ডিএসইকে পরামর্শ দিয়েছেন, তথ্য সংগ্রহের পর সেই তথ্য চূড়ান্ত করার আগে এ বিষয়ে ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাখ্যাও নেওয়া উচিত। এরপর কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার পরই তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো দরকার। তবে বাজারের স্বার্থে ডিএসইর পক্ষ থেকে তদন্তের উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বৈঠকে সবাই একমত পোষণ করেন। তবে তাঁরা তদন্তের প্রক্রিয়া আরও উন্নত করার পরামর্শ দেন।
এ ছাড়া বাজারে যেসব বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবের লেনদেন স্থগিত রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএসইকে প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেন শীর্ষ ব্রোকাররা।
এ ছাড়া মন্দা বাজারেও যাতে বাজার গতিশীল থাকে, সে জন্য শর্টসেল সুবিধা চালুর দাবি জানান ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীরা। তাঁরা বলেন, এ ধরনের সুবিধা থাকলেও বাজারের খারাপ সময়েও শেয়ার লেনদেন বাড়বে। শর্টসেল হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে পড়তি বাজারে বিনিয়োগকারীর লোকসানে থাকা শেয়ার কয়েক মাসের জন্য ধার নিতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস। নির্ধারিত সময় শেষে ওই শেয়ার আবার বিনিয়োগকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যে কয় মাসের জন্য শেয়ার ধার নেওয়া হয়, ওই কয় মাসের জন্য সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকে আর্থিক সুবিধা দেয় সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস। এ ধরনের সুবিধায় বিনিয়োগকারীর কোনো ধরনের লোকসান হয় না। নির্ধারিত সময় শেষে বিনিয়োগকারী শেয়ার ফেরত পান। তার সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য শেয়ার ধার দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে।
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন বা ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম, ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও, শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউস লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজ, সিটি ব্রোকারেজ, ব্র্যাক ইপিএল, ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ, ইবিএল সিকিউরিটিজ, আইডিএলসি সিকিউরিটিজ, এমটিবি সিকিউরিটিজসহ শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ ব্যক্তিরা।
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীরা বাজারের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। বাজারের যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্তকে সবাই স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সেটি যেন বাজারে ভীতি না ছড়ায়, সে জন্য তদন্তের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি, শর্টসেল সুবিধা, ডে নেটিং, লেনদেন নিষ্পত্তির সময় কমানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।