জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোর অনেক টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। ইতিমধ্যে ডলার কিনতে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে। আবার জীবন চালানোর খরচ বেড়ে গেছে। ফলে মানুষ সঞ্চয় কমিয়ে দিয়েছেন, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। এ জন্য আমানতের সুদহার বাড়াতে হচ্ছে অনেক ব্যাংককে। তবে ব্যাংক খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই।’

ব্যাংকের তারল্য কোথায় যাচ্ছে

ব্যাংক খাতে গত সেপ্টেম্বরে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আর ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ফলে যে আমানত জমা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ যাচ্ছে। আবার ডলার কেনা, রেমিট্যান্স কেনা, রপ্তানি বিল নগদায়নে বাড়তি টাকা বের হচ্ছে ব্যাংকগুলো থেকে। আবার অনেকে সঞ্চয় ভেঙে চলছেন। নতুন করে সঞ্চয়ও কমে এসেছে। ব্যবসায় মন্দার কথা বলে ব্যবসায়ীরাও ঋণ পরিশোধ কমিয়ে এনেছেন। ফলে খেলাপি ঋণও বাড়ছে।

গত অর্থবছর (২০২১-২২) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সব মিলিয়ে ৭৬২ কোটি ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ধারা অব্যাহত আছে চলতি অর্থবছরেও। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ পর্যন্ত ৫৫৭ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে গত ১৫ মাসে রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার ৩১৯ কোটি ডলার বাজারে ছেড়েছে। গড়ে ৯৫ টাকা হিসেবে, যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যা ব্যাংকগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে।

গত বছরের জুনে দেশে ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৭১ কোটি টাকা। যা গত জুনে কমে হয় ৩ লাখ ৪৭ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। আর গত সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ মানি কমে হয় ৩ লাখ ৪০ হাজার ৮০ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ মানির মধ্যে ব্যাংকের ভল্ট ও মানুষের হাতে ছিল ২ লাখ ৬১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। যা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যা ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এখন আগের চেয়ে মানুষ বেশি নগদ টাকা উত্তোলন করছেন।

যে দেশের নগদ টাকা ও ব্যাংকের বাইরে টাকার পরিমাণ যত কম, সেই দেশের অর্থনীতির গতি তত বাড়ে। কারণ, ব্যাংকের বাইরে টাকা থাকলে তা অর্থনীতিতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখে না।

টাকার দামও বাড়ছে

টাকার চাহিদা বাড়ায় অনেক ব্যাংক আমানতে সুদ বাড়িয়েছে। যে ব্যাংক যত দুর্বল ও বেশি চাহিদা, তাদের সুদও তত বেশি। আবার এসব ব্যাংক এ সময়ে আমানত ধরতে নিয়ে এসেছে বিশেষ আয়োজন। কর্মকর্তাদের আমানত আনার জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। আবার ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত আনছে তারা।

এখন ঋণে সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ। ৮ শতাংশ সুদে যেসব ব্যাংক আমানত আনছে, তারা কীভাবে ব্যবসা করছে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, আমানতের সুদের সঙ্গে রয়েছে পরিচালন খরচ। আবার মুনাফাও করতে হয়।

 এদিকে এখন এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে কলমানিতে টাকা ধার করতে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। এক বছর আগে যা ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ৭ দিন মেয়াদের জন্য টাকা ধারে সুদ সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও নিয়মিত ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে রেপোর মাধ্যমে টাকা ধার দেওয়া বাড়িয়েছে। প্রয়োজনে বিশেষ তারল্য সহায়তাও দিচ্ছে। এতে সুদহার ধরছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এভাবে গত বৃহস্পতিবার টাকা ধার দিয়েছে ১১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি জাফর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়ায় আমরা ইতিমধ্যে কিছু আমানত পণ্যের মুনাফার হার বাড়িয়েছি। আশা করছি, বিনিয়োগের মুনাফার হারও বাড়বে।’

তারল্য পরিস্থিতি

বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ব্যাংকে টাকা জমা করে। সেই টাকার নিরাপত্তার জন্য প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে তার ১৭ শতাংশ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে সিআরআর (নগদ জমার) ও এসএলআর (বিধিবদ্ধ জমা) হিসেবে জমা রাখতে হয়। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর জমা রাখতে হয় সাড়ে ৯ শতাংশ অর্থ। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দেয় ব্যাংকগুলো। প্রচলিত ধারার ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের ৮৭ টাকা ও ইসলামি ধারার ব্যাংক ৯২ টাকা ঋণ দিতে পারে।

গত ৩০ জুন ব্যাংকগুলোতে আন্তব্যাংক ও সরকারি আমানতসহ মোট আমানত ছিল ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ ছিল ১৩ লাখ ২০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা।

২৮ জুলাই আমানত কমে হয় ১৬ লাখ ৫ হাজার ৫০১ কোটি টাকা, ওই সময়ে ঋণ বেড়ে হয় ১৩ লাখ ২১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। গত ২৯ সেপ্টেম্বর আমানত বেড়ে হয় ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, ঋণ বেড়ে হয় ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

২৭ অক্টোবর আমানত কিছুটা কমে হয় ১৬ লাখ ২৭ হাজার ২৪০ কোটি টাকা ও ঋণ বেড়ে হয় ৬০ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। তবে ৩ নভেম্বর আমানত বেড়ে হয় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা ও ঋণ বেড়ে হয় ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা।

যদিও গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে আন্তব্যাংক ও সরকারি ছাড়া নিট আমানত ১৪ লাখ ৮২ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা ও ঋণ (ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড) ১৭ লাখ ৩৪ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত টাকা ধার দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতে কোনো তারল্যসংকটও নেই।

সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এখন সংকটের সময়ে মানুষ সঞ্চয় কমাবে, এটাই স্বাভাবিক। আবার সরকার ঋণ করছে, ব্যাংকগুলোও ডলার কিনছে। ফলে টাকায় কিছুটা টান পড়বেই। তবে সুদহারের ছয়–নয় নীতির কারণে ব্যাংক খাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া রেপো দিয়ে ডলার কিনতে পারে ব্যাংক। সেটি না করার কারণে ব্যাংক খাতের তারল্যে চাপ বেড়েছে। এখন সুদহার বাড়িয়ে দিলে আমানত আবার বাড়তে শুরু করবে।