শিগগিরই চীনের সঙ্গে জিসিসির মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি

চীনের সঙ্গে গালফ কো-অপারেশন (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলোর সম্পর্কোন্নয়ন হচ্ছে। দুই পক্ষ এখন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দ্বারপ্রান্তে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে দ্রুত মীমাংসায় পৌঁছাতে জোর দিয়েছেন। খবর দ্য ন্যাশনাল নিউজ।

চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং বলেন, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন।

অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, নির্মাণ স্থাপনা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি—এসব খাতে চীন ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত অংশীদারি বাড়াতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে বলে তাঁর মত।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ ও সাইদি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নাসের সাইদি ন্যাশনাল নিউজকে বলেন, চলতি বছরেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই হতে পারে, যদিও ২০০৪ সাল থেকে চীন ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এফটিএ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে গত ১৯ বছরে বাণিজ্য নিয়ে অনেক বিষয়েই একমত হয়েছে দুই পক্ষ।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সৌদি আরব সফর করেন। তখন সৌদি আরব ও চীন জ্বালানি ও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগবিষয়ক সমঝোতা স্মারকে সই করে। এ ছাড়া দুই দেশের নেতারা সৌদি ভিশন-২০৩০ এবং বেইজিং রোড অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভের লক্ষ্য অর্জনের ঐকমত্যে সই করে।

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ। চীন সৌদি তেলের প্রধান ভোক্তা। দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল সৌদি আরব। কিন্তু সেই সমীকরণ অনেকটাই ঘুরে যেতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভুল নীতির কারণেই সৌদি আরব চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী হচ্ছে।

ইউয়ানে তেল কিনতে চায় চীন

সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন চীনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ডলারকে পাশ কাটাতে চীন ইতিমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে রুবল ও ইউয়ান বিনিময় করে কেনাবেচা করছে। এতে চীনা মুদ্রা ইউয়ান শক্তিশালী হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ডলার এড়িয়ে চলার নীতি আরও বেগবান হয়েছে।

তবে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত মুদ্রা ডলার। এই বাস্তবতায় দীর্ঘ মেয়াদে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হলে সৌদি আরবের সহযোগিতা দরকার চীনের। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান গ্রহণ করলে চীনের পোয়াবারো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা হওয়ার পথে এক ধাক্কায় কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে ইউয়ান। সৌদি আরবও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ন্যাশনাল নিউজ বলছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ডলারের ভিত্তিতে দাম নির্ধারিত হলেও মূল্য পরিশোধে ইউয়ান ব্যবহার করা হতে পারে।

বিষয়টি হচ্ছে, সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ। রিয়াদ চীনা মুদ্রা গ্রহণ করলে এই অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিকারক অন্য দেশগুলো উৎসাহিত হবে, সাহসও পাবে। অর্থাৎ বাজারে চীনা মুদ্রার বিষয়ে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে, তাতে তারা অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লে রিয়াদ ও বেইজিং উভয়ই লাভবান হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য করতে তাই চীনের এত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা।

এর আগে গত মার্চে বৈশ্বিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয় একটি সংবাদ। সেখানে বলা হয়, সৌদি আরব থেকে কিছু তেলের চালান ইউয়ানে কিনতে দেশটির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে আলোচনা করছে বেইজিং।

সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০

সৌদি সরকারের ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নে চীনকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে মনে করছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পগুলোয় চীনা কোম্পানির সম্পৃক্ততা বাড়াতে চাইছেন তিনি।

গুরুত্বপূর্ণ এসব মেগা প্রকল্পের মধ্যে আছে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের ‘ফিউচারিস্টিক’ মেগাসিটি। প্রযুক্তিনির্ভর এই শহরে ঢুকতে হলে চেহারা শনাক্ত ও নজরদারির প্রযুক্তির আওতায় আসতে হবে মানুষকে। সে জন্য চীনের সহায়তা জরুরি।