প্রতিবছর আয়কর খাতে নানা ধরনের করছাড় দেওয়া হয়। যদিও এই করছাড় নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। অভিযোগ আছে, প্রভাবশালীরা এসব করছাড়ের সুবিধা পান। ফলে সরকার বঞ্চিত হয় প্রকৃত করপ্রাপ্তিতে। আবার করছাড় দেওয়ার ফলে তৈরি পোশাকসহ কিছু শিল্প খাত এগিয়ে গেলেও এখন আর এসব খাতে ছাড়ের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু আয়কর খাতে বছরে কী পরিমাণ করছাড় দেওয়া হয়, তা নিয়ে কোনো প্রতিবেদন এত দিন ছিল না।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে করছাড়ের পরিমাণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগ। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার ৮১৩ কোটি টাকার আয়কর ছাড় দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ৬৮ শতাংশ বা ৮৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার করপোরেট করছাড় দেওয়া হয়। বাকি প্রায় সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকার ছাড় দেওয়া হয় ব্যক্তি পর্যায়ের করদাতাদের। হিসাবটি করা হয়েছে ২০২০-২১ অর্থবছরের আয়কর ধরে। এনবিআর বলছে, ছাড় দেওয়া আয়করের পরিমাণ ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের সমান।
করছাড়ের পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতকে করছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে কোনটি নিজের পায়ে দাঁড়াল, কোনটি দাঁড়াতে পারল না, তা দেখা উচিত।
অতিপ্রয়োজনীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বছরে যত অর্থ খরচ করা হয়, এর বেশি করছাড় দেওয়া হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—উভয় খাত মিলিয়ে প্রতিবছর জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশও খরচ হয় না।
এনবিআরের আয়কর বিভাগ প্রথমবারের মতো কর অব্যাহতির পরিমাণ নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতে ২১ হাজার ৬৬৪ জন করদাতা, ৩৮১ ফার্ম এবং ১ হাজার ৯৩০ কোম্পানির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ৯৭টি খাতে করছাড় দেওয়া হয়। সমাজকল্যাণ, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্প খাতে সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষা, শেয়ারবাজার চাঙা করা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহায়তা, রপ্তানি উন্নয়ন, শিক্ষাসহায়তাসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এসব করছাড় দেয় এনবিআর।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় হয়েছে। এ ঋণের অন্যতম শর্ত হলো বাংলাদেশকে কর অব্যাহতি সুবিধা কমাতে হবে। ওই শর্তের পরই নড়েচড়ে বসে এনবিআর। কর অব্যাহতি কোন কোন খাতে আছে, কোথায় কর অব্যাহতি কমানো সম্ভব—এসব নিয়ে এনবিআর সদস্য সামস উদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির পক্ষ থেকে করছাড়ের এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
করছাড় বা অব্যাহতি নিয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, করছাড়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিকই আছে। বিনিয়োগ, রপ্তানিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে উৎসাহ দিতে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে কর্মসংস্থান বাড়ে। করছাড়ে সাময়িক রাজস্ব ক্ষতি হলেও এটিকে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। তিনি মনে করেন, করছাড়ের পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতকে করছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে কোনটি নিজের পায়ে দাঁড়াল, কোনটি দাঁড়াতে পারল না, তা দেখা উচিত।
কোন খাতে কত অব্যাহত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, করপোরেট করের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করছাড় পায় ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা। তারা বছরে ছাড় পায় ১৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এরপর ছাড় পায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এ খাতের করছাড়ের পরিমাণ ৮ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাত পায় ৩ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকার সুবিধা। ব্যক্তি পর্যায়ের করদাতাদের মধ্যে প্রবাসী আয় খাতে সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকার করছাড় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পোলট্রি ও মাছ চাষের সঙ্গে জড়িতদের ২ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ৯৬৫ কোটি টাকার করছাড় দেওয়া হয়েছে।