ফার্নেস তেলে ৬৪৪ কোটি টাকা বাড়তি নেয় বিপিসি

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ফার্নেস তেল বিক্রি করে প্রতি লিটার ৮৬ টাকায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে নিয়মিত এ তেল কেনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিশ্ববাজারে কমলেও গত দেড় বছরে দাম সমন্বয় হয়নি দেশে। বিপিসির চেয়ে অনেক কম দামে ফার্নেস তেল আমদানি করছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ হিসাবে দেড় বছরে পিডিবির কাছ থেকে ৬৪৪ কোটি টাকা বাড়তি নিয়েছে বিপিসি।

ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে এ হিসাব দিয়েছে পিডিবি। দাম নির্ধারণে বিপিসির প্রস্তাব নিয়ে এ শুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটির কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এ শুনানি হয়। তেল বিপণন করা সরকারি চার কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল একই প্রস্তাব দিয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২ আগস্টে ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ করেছিল বিপিসি।

বিপিসি ও চার বিপণন কোম্পানি প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের দাম ৮১ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। এটি পর্যালোচনা করে বিইআরসি গঠিত কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ৭৪ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে এতে আপত্তি জানিয়েছে পিডিবি। তারা বলেছে, প্রতি লিটার ফার্নেসের দাম ৫০ টাকা ৮৩ পয়সা হতে পরে।

শুনানিতে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, আমদানি করলে খরচ অনেক কম পড়ছে, বিপিসির কাছ থেকে কিনতে গেলে অনেক বেশি খরচ পড়ছে। ফার্নেস তেলের কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাম সমন্বয় এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়া উচিত।

দেশে ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ৫৪টি। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস সরবরাহ করে বিপিসি। আর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেরা আমদানির পাশাপাশি বিপিসি থেকেও নেয়। মোট চাহিদার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বিপিসি দেয়, আর বাকিটা আমদানি করা হয়। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস তেল ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ টন।

লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববাজারে নিয়মিত দাম কমার পরও বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে পিডিবি। একই সঙ্গে বাড়তি নেওয়া ৬৪৪ কোটি টাকা সমন্বয়ের দাবি করেছে তারা।

পিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, গত অর্থবছরে পিডিবি ঘাটতি মেটাতে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে সরকার থেকে। এরপরও ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা লোকসান করেছে। আর তেল বিক্রি করে একই অর্থবছরে বিপিসির লাভ ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। ফার্নেস তেলের দাম কমানো না গেলে গরমের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কার কথা জানান তিনি।

তবে বিপিসি দাবি করেছে, পিডিবির আন্তর্জাতিক বাজারদরের তথ্য সঠিক হলেও আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য খরচ হয়তো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

এদিকে তেলের দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি তেল বিপণন কোম্পানিগুলো তাদের বিতরণ চার্জ ৫৫ পয়সা থেকে বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। কোম্পানিগুলোর দাবি, ফার্নেস তেল বিক্রি করে তাদের লোকসান হচ্ছে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি বিতরণ মার্জিন ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ২০ পয়সা করার দাবি করেছে। বিইআরসির কারিগরি কমিটি বিতরণ ৮৫ পয়সা করার পক্ষে মতামত দিয়েছে। যদিও প্রশ্নোত্তর পর্বে পদ্মা অয়েল স্বীকার করেছে, আগের বছরের চেয়ে কোম্পানির মোট মুনাফা গত অর্থবছরে বেড়েছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সব তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হবে। সবার সমান সুবিধা নিশ্চিত করেই আদেশ দেওয়া হবে। গণশুনানির বিষয়ে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লিখিত মতামত দিতে পারবেন যে কেউ।

গণশুনানিতে আরও অংশ নেন বিইআরসির সদস্য মো. আবদুর রাজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার।