দান–খয়রাত শীর্ষ ধনীদের একটি বিশেষ ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এর মধ্য দিয়ে সমাজের দারিদ্র্য মিটে যাবে তা নয়, কিন্তু দান–খয়রাত যে একেবারে কাজে লাগে না, তা নয়। পাশ্চাত্যের অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তিগত দানের অর্থে গড়ে উঠেছে।

বিল গেটস ফাউন্ডেশন পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় অনুদান দিয়ে থাকে, বিশেষত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এসব দান-খয়রাতের অর্থে অনেক মানুষের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের বৃত্তির অর্থে পড়াশোনা করে অনেকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের দেশেও তেমন অনেক নজির আছে।
আবার অনেকে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ধনীরা নিজেদের স্বার্থেই দান-খয়রাত করেন। এই অভিযোগের মধ্যে সত্যতার কিছু উপাদান আছে ধরে নিয়েও বলা যায়, এই দানের উপকারিতা আছে।      

দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ ধনীরা ঠিক পশ্চিমা কায়দায় দান-খয়রাত না করলেও এখানে এ সংস্কৃতি ভিন্ন রূপে বিরাজ করে। বলা যায়, দান-খয়রাতের দীর্ঘ ইতিহাস আছে ভারতীয় উপমহাদেশে। ইসলাম ধর্মে জাকাতের রীতি দানের সংস্কৃতিতে পরিপুষ্ট করেছে। তবে আমাদের অঞ্চলে দান–খয়রাত অনেকটাই অপ্রাতিষ্ঠানিক। দেখা যায়, গ্রামে ধনী মানুষেরা বেড়াতে এলে আশপাশের দরিদ্র মানুষেরা ভিড় করেন। ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলো গরিব মানুষকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে। দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়া হয়—সরকার ও ব্যক্তি উভয় পক্ষ থেকেই। সম্প্রতি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ভোটের আগে খয়রাত গরিব মানুষকে সাহায্য করার সেরা পন্থা নয়। তবে খয়রাত একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেননি তিনি। তাঁর মত, এ ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা থাকা দরকার; কারণ এ মুহূর্তে এ রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তাঁর বক্তব্য মূলত নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোট টানতে ঢালাও দানছত্রের রীতির বিরুদ্ধেই। যে কারণে তিনি নির্দিষ্ট করে ভোটের আগে খয়রাতের কথাই বলেছেন ও শৃঙ্খলার প্রয়োজনের কথা তুলেছেন।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্প্রতি দান-খয়রাত প্রসঙ্গে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, দানের সংস্কৃতি সে দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। এ প্রেক্ষাপটে মনে করা হচ্ছে, অভিজিৎ এ বিতর্কে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছেন।

দান-খয়রাতের অর্থনীতি নিয়ে ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বইয়ে বিশদ আলাপ করেছেন লেখক আকবর আলি খান। তিনি লিখেছেন, ‘দান-খয়রাতের বিষয়টি ধর্মতত্ত্বের একচেটিয়া দখলে রয়েছে। দান-খয়রাত হচ্ছে আখিরাতের পাথেয়।...বলা হয়েছে যে একটি ভুট্টার বীজ হতে জন্ম নেয় সাতটি শিষ আর প্রতিটি শিষে শত দানা ধরে। তেমনি ছোট একটি দানের বরকত অনেক। সমাজবিজ্ঞান ইহকাল নিয়ে ব্যস্ত; পরকাল সমাজবিজ্ঞানের চিরাচরিত গণ্ডির বাইরে। যে মূল্যবোধের ওপর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত, তা দান-খয়রাতের অনুকূল নয়। দান-খয়রাতের জন্য প্রয়োজন স্বার্থহীন ব্যক্তি। অর্থনীতির পূর্বানুমান (অনুমান) হচ্ছে সকল মানুষই স্বার্থপর। প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিস্বার্থই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালু রেখেছে।’

অর্থাৎ বিষয়টি পরার্থপরতার। একশ্রেণির মানুষের হাতে বিপুল ধনসম্পদ জড়ো হবে আর তাঁরা সমাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে দান-খয়রাত করবেন, রাষ্ট্রকে কর দেওয়া ছাড়াও এটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে যে ব্যবস্থা একজন মানুষকে শতকোটি ডলারের মালিক হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, তাতে নিঃসন্দেহে অনেক গলদ আছে। এমনকি বিল গেটস নিজেও একবার বলেছিলেন, এত অর্থের মালিক হলাম কী করে? প্রকৃতপক্ষে, ব্যবস্থায় গলদ আছে বলেই আমি এত সম্পদের মালিক হতে পেরেছি।

বিল গেটসের এ কথার সত্যতা আছে। নিউইয়র্কভিত্তিক প্রোপাবলিকা নিউজ সাইটে যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবেরদের আয়কর ফাঁকি দেওয়ার বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে গত বছর। এতে দেখা যায়, ২০০৭ ও ২০১১ সালে আমাজন প্রধান জেফ বেজোস কোনো আয়কর দেননি। অন্যদিকে, টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক ২০১৮ সালে আয়কর দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২৫ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের তুলনায় গড়ে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কম কর দেন।

প্রোপাবলিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও সম্পাদক জেসি ইসিংগার ‘টুডে প্রোগ্রাম’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যদি আপনি শতকোটি ডলারের মালিক হন, তবে আপনি একদম পুরো করই মওকুফ পাবেন। শীর্ষ ধনীরা সম্পূর্ণ আইনি পথে কর এড়িয়ে যেতে পারেন। এ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর খুঁজে বের করা, ক্রেডিট খোঁজা বা ছাড় খুঁজে বের করার ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ।’

কীভাবে ধনীরা কর ফাঁকি দেন তা বোঝাতে জেসি বলেন, ‘কোম্পানিতে তাদের শেয়ারের মাধ্যমে মোট সম্পদের পরিমাণ যখন হু ‍হু করে বাড়তে থাকে, তখন সেগুলো তাদের আয় হিসেবে গণনায় আসে না। এর বাইরে আরও অনেক কিছু আছে। তাঁরা খুবই বেপরোয়াভাবে করছাড়ের সুবিধা নেন।

অথচ প্রখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি সম্প্রতি নিজের ব্লগে লিখেছেন, ২০ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুক্রমিক করব্যবস্থা (যার যত বেশি আয়, তার করহার তত বেশি) অত্যন্ত সফল ছিল। ১৯৩০-৮০ সাল পর্যন্ত সে দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষের আয়কর হার ছিল ৮০-৯০ শতাংশ। ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তখন সে দেশে আজকের মতো বৈষম্য ছিল না এবং শিক্ষায় তারা সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। সে জন্য তাঁর মত, শতকোটি ডলারের মালিকদের ওপর ৮০-৯০ শতাংশ করারোপ করা হোক। আর সেই অর্থের বড় অংশ সরাসরি দরিদ্র দেশগুলোতে পাঠানো হোক।

আয়কর হার কমার কারণে যা ঘটেছে তা হলো, আজ যুক্তরাষ্ট্র উন্নত দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দিচ্ছে। জোসেফ স্টিগলিৎস এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের আয় মহাজাগতিক হারে বাড়লেও মধ্যশ্রেণির একটি বড় অংশের আয় কয়েক দশক ধরে স্থবির। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ যুগে এসব পরিবারের শিশুদের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পাবে।

খয়রাতকে বাদ দিয়ে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পদ পুনর্বণ্টনের উপায় তবে কী হতে পারে? অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, দরিদ্রদের ক্ষেত্রে ঋণ মওকুফ করার পদ্ধতি ছিল সবচেয়ে সাবেকি। বড় ঋণগ্রহীতারা কেউ দরিদ্র নন। ফলে এটা করাও সহজ ছিল। তবে কার্যকর এবং উন্নততর উপায় হতে পারে ধনীদের ওপর করের ভার বাড়ানো। সেই কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি তহবিল থেকে দরিদ্রের কাছে পৌঁছাতে পারে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অসাম্য কমানো ও সম্পদ পুনর্বণ্টনের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল তৈরি করা যেতে পারে। যে বিষয়ে টমাস পিকেটি অনেক বছর ধরেই খুবই উচ্চকণ্ঠ।