অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতি আরও কমল না কেন
প্রতিবেশী দেশগুলো মূল্যস্ফীতি কমাতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে আট মাস ধরেই তা ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে, এ দেশে তা হয়নি। এখনো সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি আছে। আট মাসে ধরেই মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষকে বিপাকে ফেলেছে। কারণ, প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তাঁদের বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনতে কষ্ট হচ্ছে।
গতকাল রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগের দুই মাস ডিসেম্বর আর নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসছে। তারা সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি পাবে, যা কমানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কতটা কমল
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। এর আগের মাসে, অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে মূল্যস্ফীতি কখনো সাড়ে ৭ শতাংশ, কখনো–বা ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই লক্ষ্যে কখনোই নামেনি মূল্যস্ফীতি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যতটুকু মূল্যস্ফীতি কমানোর দরকার ছিল, তার কাছাকাছি আনা সম্ভব হয়নি। এক অঙ্কের ঘরে এলেও তা উচ্চপর্যায়ে এক জায়গায় আটকে আছে।জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়
ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগের মাস নভেম্বরে তা বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে উঠেছিল। ফলে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। চার মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
কেন কমল না, যা বলেন জাহিদ হোসেন
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যতটুকু মূল্যস্ফীতি কমানোর দরকার ছিল, তার কাছাকাছি আনা সম্ভব হয়নি। এক অঙ্কের ঘরে এলেও তা উচ্চপর্যায়ে এক জায়গায় আটকে আছে, যা সামাল দেওয়া নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার কেন পারল না—এ প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাহিদাজনিত দৃষ্টি থেকে পলিসি রেট বাড়ানো হয়। এতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমলেও তা মূল্যস্ফীতি কমাতে বড় অবদান রাখতে পারেনি।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, মূল্যস্ফীতি না কমার পেছনে সরবরাহের দুটি কারণ আছে। প্রথমত, চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের বড় বড় বাজার খেলোয়াড়দের কারসাজি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন থেকে শুরু করে পদে পদে পেশিশক্তির চাঁদাবাজিও বন্ধ হয়নি। এসব কারণেও মূল্যস্ফীতি আরও কমানো যায়নি।
মূল্যস্ফীতি কীভাবে প্রভাব ফেলে
মূল্যস্ফীতি একধরনের করের মতো। আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়, কিন্তু হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সে অনুযায়ী আপনার আয় না বাড়লে আপনাকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কাটছাঁট করতে হবে।
বিবিএস বলছে, গত জানুয়ারিতে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এর মানে হলো মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাজার থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে যদি আপনার খরচ হয় ১০০ টাকা, এক বছর পর, অর্থাৎ এ বছরের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ হওয়ার মানে হলো ২০২৬ সালের জানুয়ারি, অর্থাৎ এক বছর পর একই পণ্য ও সেবা কিনতে আপনাকে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা খরচ করতে হয়েছে।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলো কত মূল্যস্ফীতি
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় সহনীয় পর্যায়ে আছে। যেমন জানুয়ারি মাসে ভারতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ ছাড়া পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এখন যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি চলছে। এক বছর আগেও এই দুটি দেশে মূল্যস্ফীতি বেশ বেশি ছিল। এ ছাড়া নেপাল ও মালদ্বীপে যথাক্রমে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ ও দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি চলছে।