একসময় অর্থ ব্যবস্থাপনা বা ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং মানে ছিল একটি নির্দিষ্ট ছক। নিয়মিত আয়, সংযত ব্যয়, ধীরে ধীরে সঞ্চয় এবং শেষে নিশ্চিন্ত অবসর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছক বদলে গেছে। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি অর্থকে দেখছে ভিন্নভাবে। শুধু ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নয়; বরং বর্তমানের জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গেও তারা অর্থের সম্পর্ক খুঁজে নিচ্ছে।
সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ছে কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জেন-জি যেভাবে অর্থ ও আর্থিক পরিকল্পনাকে সংজ্ঞায়িত করছে, নতুন বাস্তবতায় তা কতটুকু টেকসই?
বাংলাদেশজুড়ে এই প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে পারাটা জরুরি। দেশের প্রায় ২৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন জেন-জি প্রজন্মের। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর, আবার একই সঙ্গে বাস্তবতাসচেতনও। তারা শুধু বাজারের ভোক্তা নয়; বরং নতুন অর্থনৈতিক আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি।
আগের প্রজন্মের সঙ্গে তাদের এই পার্থক্যের জায়গাটি বোঝা জরুরি। আশি বা নব্বইয়ের দশকে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁদের জন্য অর্থ ব্যবস্থাপনা কিছুটা হলেও কম জটিল ছিল। নির্দিষ্ট চাকরি, নিয়মিত আয়, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্র্যাচুইটি—সব মিলিয়ে একটি জীবন ছিল বেশ ধারাবাহিক। তার ওপর পরিবারও অনেকটা নিরাপত্তা দিত, তাই অনিশ্চয়তার চাপ এতটা প্রকট ছিল না।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জেন-জি বড় হয়েছে বৈশ্বিক মহামারি, মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া কর্মসংস্থানের বাস্তবতায়। কাজের ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং, চুক্তিভিত্তিক কাজ কিংবা একাধিক আয়ের উৎস তৈরি করা হয়ে উঠছে তাদের কাছে নতুন স্বাভাবিকতা। অনিয়মিত এই আয়ের বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করাটা তাই কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই জেন-জি প্রজন্ম নতুনভাবে ভারসাম্য খুঁজছে। তাদের কাছে অর্থ মানে শুধু ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়; বরং বর্তমানের জীবনমানকে আরও শক্তিশালী করা। তারা অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়, নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতাকে মূল্য দেয়। বিশ্বব্যাপী জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ জেন-জি মনে করে, অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতায় খরচ করা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত। তাদের কাজের পরিবেশ ও ব্যক্তিজীবনের চাহিদাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেটলাইফ বাংলাদেশের এমপ্লয়ি বেনিফিট ট্রেন্ডস জরিপেও দেখা যায়, ব্যক্তিগত বা পেশাগত চ্যালেঞ্জের সময় ৮৩ শতাংশ জেন-জি কর্মীর কাছে নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি একটি প্রধান চাহিদা। অর্থাৎ তারা গতানুগতিক নিয়মের চেয়ে তাদের সময় ও কাজের স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়, যা তাদের আর্থিক ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে জেন-জি প্রজন্মের কাছে ‘সফট সেভিংস’ ধারণাটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, যা মূলত কঠোরভাবে টাকা জমিয়ে দ্রুত অবসরে যাওয়ার বা ফিন্যান্সিয়াল ইনডিপেনডেন্স, রিটায়ার আর্লি ধারণার বিপরীত।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যানেও এই মানসিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন ইনটুইটের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ জেন-জি তরুণ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণে দ্বিধা বোধ করে। তারা ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে অভিজ্ঞতা, জীবনমান ও মানসিক সুস্থতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
যদিও বাংলাদেশে এই সফট সেভিংসের প্রভাব নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই, বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের দেশের জেন-জিরাও এই বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতি আগ্রহী হওয়াটাই স্বাভাবিক। যার মূল আকর্ষণটা হচ্ছে ‘নমনীয়তা’ বা ফ্লেক্সিবিলিটি। কিন্তু এই চলতি প্রবণতার কিছু সমস্যা রয়েছে। আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি, অনেকেই মনে করেন, মাস শেষে সামান্য কিছু টাকা ব্যাংকে জমিয়ে রাখাই হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং।
মেটলাইফে আমরা এমন অনেক গ্রাহকের পাশে দাঁড়িয়েছি, যাদের বড় কোনো দুর্ঘটনা কিংবা পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর পর পুরো পরিবার পথে বসতে যাচ্ছিল। তখন বিমার টাকা তাদের একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সঠিক সুরক্ষা ছাড়া শুধু সঞ্চয় করা আসলে ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং নয়, এটা ঝুঁকিপূর্ণ। জেন-জির জন্য এটা চালিয়ে যাওয়া বড় ভুল হবে।
আগের প্রজন্মের কাছে বিমার মতো আর্থিক সুরক্ষা এড়িয়ে চলার অন্যতম কারণ ছিল সচেতনতা ও স্পষ্ট ধারণার অভাব। কিন্তু আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জেন-জির জন্য সেই সমস্যা নেই। আগের প্রজন্মের ঘাটতি ছিল তথ্যের আর এই প্রজন্মের ঘাটতি মূলত উদাসীনতায়। তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই সময়ে সুরক্ষা ছাড়া সঞ্চয় মানে হলো দুর্বল একটি দেয়ালের মতো, যা আকস্মিক বড় আঘাতে বাকি জীবনকে এলোমেলো করে দিতে পারে।
আগের প্রজন্মের অনেকেই জীবনকে একটি সরলরেখার মতো ভেবেছেন। পড়াশোনা, কাজ, তারপর অবসর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনের পথে নানা পরিবর্তন আসবেই। বিয়ে, সন্তান নেওয়া, বৃদ্ধ মা–বাবার যত্ন কিংবা হঠাৎ কোনো বড় অসুস্থতা। এ ছাড়া আরও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। তার মানে অবসর নেওয়ার পর একটি দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার চিন্তা এখন আমাদের করতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে হাসপাতাল খরচ এবং হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি রোগের মতো গুরুতর রোগের প্রাদুর্ভাব। তার মানে শুধু দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকাটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং ভালো ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে জেন-জির জন্য কীভাবে করা উচিত একটা টেকসই আর্থিক পরিকল্পনা? সে জন্য আর্থিক পরিকল্পনায় কিছু বিষয়কে সম্পূর্ণ ‘নন-নেগোশিয়েবল’ বা অপরিবর্তনীয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যেমন নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া, একটি সুনির্দিষ্ট ইমার্জেন্সি ফান্ড বা জরুরি তহবিল, ন্যূনতম একটি অবসর পরিকল্পনা, সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ এবং আকস্মিক কোনো চিকিৎসাজনিত বা জীবনঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য জীবন ও স্বাস্থ্যবিমার মতো সুরক্ষা নেওয়া।
দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল নির্ভরতার মধ্যেও সতর্ক থাকার প্রয়োজন কম নয়। অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগের প্রলোভন কিংবা দ্রুত লাভের ফাঁদে পড়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। কোনো অফার যদি অতিরিক্ত ভালো মনে হয়, তবে যাচাই না করে সেখানে যুক্ত হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি সচেতনতার অভাবে সেটিই বিপদের কারণ হতে পারে। তাই আর্থিক নিরাপত্তা এখন শুধু আয় বা সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং তথ্য যাচাই, সচেতনতা ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল।
জেন-জি প্রজন্ম অর্থ ও সঞ্চয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। তারা পুরোনো নিয়ম পুরোপুরি অস্বীকার করছে না; বরং নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যেখানে বর্তমানের স্বস্তি, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা হচ্ছে। তবে এই সমীকরণ তখনই সফল হবে, যখন এর সঙ্গে যুক্ত হবে শক্তিশালী আর্থিক সুরক্ষা।
আলা আহমদ, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, মেটলাইফ বাংলাদেশ