সঞ্চয়পত্র, এফডিআরের বিকল্প হতে পারে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড, মুনাফা কত

টাকাপ্রতীকী ছবি

অলস টাকা পড়ে আছে। বিনিয়োগের সুবিধামতো জায়গা পাচ্ছেন না। আপনার জন্য বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হতে পারে সরকারি সিকিউরিটিজ, অর্থাৎ ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড। সঞ্চয়পত্র, এফডিআরের ভালো বিকল্প হতে পারে এসব ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড। বন্ড নিয়ে ধীরে ধীরে মানুষের আগ্রহও বাড়ছে।

সঞ্চয়পত্র কিংবা এফডিআরের মতোই বেশ ভালো মুনাফা পাওয়া যায় এসব সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে। সঞ্চয়পত্রে যেমন মেয়াদপূর্তির পর ১০-১১ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়, ট্রেজারি বিল-বন্ডেও কমবেশি একই হারে মুনাফা মেলে। এফডিআরে সুদের হারও প্রায় একই রকম।

সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড কী

ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড হচ্ছে সরকারি সিকিউরিটিজ। ট্রেজারি বিল সংক্ষেপে টি-বিল হিসেবেও পরিচিত। ট্রেজারি বিলকে বলা হয় স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্র। এটি সাধারণত ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের মেয়াদে ইস্যু করা হয়। এগুলো ডিসকাউন্ট মূল্যে বিক্রি হয় এবং মেয়াদ শেষে পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের লাভ আসে ক্রয়মূল্য ও পরিশোধ মূল্যের পার্থক্য থেকে।

অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ড সংক্ষেপে পরিচিত বিজিটিবি নামে। এটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্র, যার মেয়াদ ২ বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত হয়। এসব বন্ডে নির্দিষ্ট কুপন হারে সুদ দেওয়া হয়। সুদ দেওয়া হয় সাধারণত ছয় মাস পরপর।

ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে।

এরপর সরকারের নিয়োগ করা বাজারে প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সুদের হারে নিলাম (বিড) জমা দেয়। এই নিলামপ্রক্রিয়ায় তুলনামূলক কম সুদের প্রস্তাবগুলো আগে গ্রহণ করা হয়, অর্থাৎ সুদের হার নির্ধারিত হয় বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।

সাধারণ ক্রেতারা কীভাবে কিনবেন

প্রাইমারি ডিলাররা সরাসরি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনে নেয়। পরে সেগুলো বাজারে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে।

সরকার যখন নতুন বন্ড বা বিল ইস্যু করে, তখন পিডিরা বাধ্যতামূলকভাবে সেই নিলামে অংশ নেয় এবং একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বিল-বন্ড কিনে থাকে। পিডিরা পরে সেকেন্ডারি মার্কেটে তা নিয়মিত কেনাবেচা করে।

এবার দেখা যাক, কোন ব্যাংকগুলো বন্ড কিনে থাকে। আপনি সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে চাইল কোথায় যাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংক বন্ড কেনায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। আপনি চাইলে এসব ব্যাংক থেকে বন্ড কিনতে পারেন।

আবার ক্রেতা সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠেয় নিলামে অংশ নিতে পারেন। ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ স্বল্প মেয়াদি হওয়ায় মেয়াদান্তে মুনাফা ও আসল একসঙ্গে ফেরত দেওয়া হয়।

সুদের হার কত

ট্রেজারি বিলের সুদের হার মেয়াদভেদে বিভিন্ন হারের হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ২৯ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিনের বিলের হার ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ, ১৮২ দিনের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার তুলনামূলক বেশি। যেমন ২ থেকে ৩ বছরের বন্ডে সুদের হার ১০ দশমিক ২ থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, ৫ বছরের বন্ডে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ১০ বছরের বন্ডে ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ১৫ বছরের বন্ডে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং ২০ বছরের বন্ডে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

কারা কিনতে পারেন, বিক্রির প্রক্রিয়া কী

সরকারি বিল ও বন্ড ঝুঁকিমুক্ত এবং দেশের সব শ্রেণি-পেশার নাগরিক বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। অন্যান্য বন্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা থাকলেও ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তা নেই। তাই এ বন্ডে যত খুশি বিনিয়োগ করা যায়।

ন্যূনতম বিনিয়োগের পরিমাণ এক লাখ টাকা। আবাসিক ও অনাবাসিক ব্যক্তি, ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, ভবিষ্য তহবিল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও করপোরেট সংস্থা এগুলো কিনতে পারে। সেকেন্ডারি বাজারেও তা লেনদেনযোগ্য। বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা, অর্থাৎ এগুলো কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বিজনেস পার্টনার আইডেন্টিফিকেশন (বিপি আইডি) হিসাব খুলতে হয়।

সাধারণত কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে তা করা হয়ে থাকে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), আবেদনকারী বা মনোনীত ব্যক্তির ছবি এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণ থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেকেন্ডারি বাজার থেকেও বিল ও বন্ড কিনতে পারবে। এ ক্ষেত্রে মনোনীত শাখাকে বিল ও বন্ডের মূল্যের সমপরিমাণ অঙ্কের চেক দিতে হবে।

মেয়াদপূর্তিতে বিল ও বন্ডের আসল ও সুদ যথাসময়ে প্রধান কার্যালয়ের ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট শাখায় চলে যাবে। তবে মেয়াদপূর্তির আগে যেকোনো সময় তা বিক্রি করা যায়। তবে পিডি ব্যাংককে তা জানাতে হবে।

দুটি ব্যাংক নতুন পিডি

নতুন করে দেশের দুটি বেসরকারি ব্যাংককে পিডি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এ দফায় সুযোগ পেয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার আলাদা চিঠির মাধ্যমে ওই দুই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ফলে দেশে মোট পিডি ব্যাংকের সংখ্যা বর্তমানের ২৪ থেকে বেড়ে ২৬ হয়েছে।

নতুন পিডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি তারেক রেফাত উল্লাহ খান গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে আমরা আবেদন করেছিলাম। সরকার অনুমতি দেওয়ায় ভালো হলো। আমরা এখন পিডি হিসেবে বন্ড বাজারে ভূমিকা রাখতে পারব।’