গুরুতর রোগ ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পাওয়া যাবে না জীবন বীমা করপোরেশনের বাড়তি বিমা–সুবিধা

জীবন বীমা করপোরেশনের (জেবিসি)

আগে থেকে গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্য-তথ্য গোপনকারীরা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশনের (জেবিসি) সহযোগী বিমা–সুবিধা বা রাইডার সুবিধা পাবেন না। এ সুবিধা নিতে বাধ্যতামূলকভাবে জেবিসিতে জমা দিতে হবে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য ও চিকিৎসা পরীক্ষার প্রতিবেদন।

জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) গত ২৬ জুলাই এমন শর্তসহ মোট ১৪টি নির্দেশনা জারি করেছে। জেবিসির সব আঞ্চলিক, করপোরেট, বিক্রয় ও শাখা অফিসকে নতুন নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেবিসি বিভিন্ন জীবনবিমা পলিসির সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা, গুরুতর রোগ বিমা (মেজর ডিজিজেস) এবং প্রিমিয়াম মওকুফ (ওয়েভার অব প্রিমিয়াম) সুবিধা দিয়ে থাকে। এসব সহযোগী সুবিধা বা রাইডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতি অনুসরণ এবং দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার কথা বলা হয়েছে।

রাইডার কী

সহযোগী বিমা–সুবিধা (রাইডার) হলো মূল বিমা পলিসির সঙ্গে অতিরিক্ত প্রিমিয়ামের বিনিময়ে যুক্ত করা বাড়তি সুবিধা, যা মূল বিমার সুরক্ষা বা কাভারেজ বাড়ায়। এটি স্বতন্ত্র কোনো বিমা নয়, বরং মূল বিমার অংশ। উদাহরণ হলো, কারও ২০ লাখ টাকার জীবনবিমা আছে। তিনি যদি ১০ লাখ টাকার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রাইডার যোগ করেন, তাহলে পলিসির শর্ত অনুযায়ী দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে তাঁর মনোনীত ব্যক্তি মোট ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন।

কারা পাবেন এই সুবিধা

জীবন বীমা করপোরেশনের (জেবিসি) নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রাইডার–সুবিধা শুধু সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম ব্যক্তিদের দেওয়া যাবে। আগে থেকে বিদ্যমান কোনো গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এ সুবিধার আওতায় আসবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী লিপিড প্রোফাইল, সিরাম ক্রিয়েটিনিনসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদনও দিতে হবে। জেবিসি প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, চিকিৎসকের সনদ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য চাইতে পারবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, স্থায়ী বা আংশিক শারীরিক কিংবা মানসিক অক্ষমতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা, গুরুতর রোগ বিমা এবং প্রিমিয়াম মওকুফ–সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, পক্ষাঘাতসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এ সুবিধা দেওয়া হবে না।

বলা হয়েছে, গত দুই বছরের মধ্যে কোনো গুরুতর রোগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা চিকিৎসা নেওয়ার ইতিহাস থাকলেও প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল মূল্যায়ন ছাড়া রাইডার–সুবিধা মিলবে না। এইচআইভি বা এইডস, জন্মগত গুরুতর রোগ, জীবনধারাজনিত জটিল রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও রাইডার সুবিধা না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জেবিসি বলেছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, বিপজ্জনক ক্রীড়া বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের রাইডার সুবিধা দেওয়া হবে না। পাশাপাশি রাইডার সুবিধা পেতে নির্ধারিত বয়সসীমা, স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা ও পেশাগত ঝুঁকির শর্ত পূরণ করতে হবে।

স্বাস্থ্য-তথ্য গোপন করলে দাবি বাতিল

নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমাগ্রহীতাকে আগের রোগের ইতিহাস, চিকিৎসার বিবরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ সঠিকভাবে ঘোষণা করতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা বা ভুল তথ্য দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট বিমা দাবি প্রত্যাখ্যান করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, রাইডার–সুবিধা মূল জীবনবিমা পলিসির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। কোনো কারণে মূল পলিসি বাতিল, সমর্পণ (সারেন্ডার) বা ল্যাপস হলে সহযোগী–সুবিধাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাইডার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা এবং তথ্য গোপনের কারণে উদ্ভূত বিরোধ কমাতেই এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

জেবিসির চেয়ারম্যান মো. মোখলেস উর রহমান গত সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন, যা এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি) নেই। পদাধিকারবলে প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদ সদস্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ কুতুব এমডির দায়িত্ব পালন করছেন।

জানতে চাইলে সাঈদ কুতুব গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, সহযোগী বিমা–সুবিধা বা রাইডার নিয়ে কিছু অনিয়ম হচ্ছিল, তা দূর করতেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সাঈদ কুতুব উল্লেখ না করলেও জেবিসির বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে থেকেই গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ দাবি করে রাইডার সুবিধা নিচ্ছিলেন। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য, রোগের ইতিহাস বা চিকিৎসার তথ্য গোপন করছিলেন এক শ্রেণির পলিসি গ্রাহক।

আবার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া রাইডার অনুমোদন দিয়ে আসছিল জেবিসির বিভিন্ন শাখা। শুধু তাই নয়, শাখা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বা বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই রাইডার দেওয়া হচ্ছিল। দাবি নিষ্পত্তির সময় স্বাস্থ্য-তথ্য গোপন বা অযোগ্যতার কারণে বিরোধ ও দাবি প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ঘটেছে একাধিক।